এখন প্রশ্ন—কেরল সরকার কী করবে? নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করলে জনরোষ ও মামলা দুই-ই বাড়বে। না করলে আবার মামলা পুনরুজ্জীবিত হবে মোহনলালের বিরুদ্ধে।

মালয়ালম সুপারস্টার মোহনলাল।
শেষ আপডেট: 31 October 2025 19:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক দশকেরও বেশি সময় আগের ঘটনা। ২০১১ সালে মালয়ালম সুপারস্টার মোহনলালের (Mohanlal’s trophies) বাড়িতে আয়কর দফতরের রুটিন হানা। কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন কাগজপত্র, কিছু অঘোষিত নগদ অর্থ, এর বেশি কিছু পাওয়া যাবে না। কিন্তু যা তাঁদের সামনে এল, তা যেন সিনেমার দৃশ্য—চার জোড়া হাতির দাঁত আর ১৩টি খোদাই করা আইভরির শৌখিন শিল্পবস্তু (The ivory illusion)।
মুহূর্তেই বাজেয়াপ্ত হয় সবকিছু। কারণ, ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে (Wild Life Protection Act) সরকারী অনুমতি ছাড়া হাতির দাঁত রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই বছর কেরলজুড়ে শিরোনামে উঠে আসে খবরটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোহনলালের খ্যাতি বাড়তে থাকে, মামলাটি হারিয়ে যায় প্রশাসনিক নীরবতার আড়ালে।
চোদ্দ বছর পর, ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর, কেরল হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে ফিরে এল সেই পুরনো মামলা। আদালত স্পষ্ট জানাল—মোহনলালের আইভরি রাখার সরকারি ছাড়পত্র ও মালিকানা সনদ ‘অবৈধ, বাতিল ও আইনবহির্ভূত’। এক লহমায় আদালত ভেঙে দিল সেই ভ্রম—যে, নামি মানুষ হলে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেঁচে যাওয়া যায়।
২০১১ সালের ওই বাজেয়াপ্তির পর শুরু হয় তদন্ত। মামলা যায় পেরুমবাভুর আদালতে। মোহনলালের দাবি ছিল, “একটি বন্দি হাতি স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা গিয়েছিল। দাঁতগুলো তারই। শুধু স্মৃতি হিসেবে রেখেছিলাম।”
এরপর ২০১৫ সালে রাজ্য সরকার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যাঁদের কাছে আগে থেকেই হাতির দাঁত বা অনুরূপ সামগ্রী আছে, তাঁরা জানালে মালিকানার সুযোগ পাবেন। মোহনলাল সেই সুযোগ নেন। রাজ্যের প্রধান বন্যপ্রাণ সংরক্ষক তাঁর দাবি যাচাই করে দুই জোড়া দাঁত ও ১৩টি শিল্পবস্তুর বৈধ মালিকানা দেয়।
অর্থাৎ, যা একসময়ে অপরাধ ছিল, তা পরিণত হয় “বৈধ সম্পত্তি”-তে। সরকার নিজেই আদালতে গিয়ে মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। একদল অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মী ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণবিদ হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। তাঁদের দাবি, এই বিজ্ঞপ্তি সরকারি গেজেটে কখনও প্রকাশই হয়নি, ফলে এর কোনও আইনি ভিত্তি নেই।
তাঁদের যুক্তি, গেজেটে প্রকাশ বাধ্যতামূলক, এটি জনগণকে অবহিত রাখার একমাত্র স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। গেজেট ছাড়াই বিজ্ঞপ্তি জারি করা মানে আইনকে পাশ কাটানো।
এই অভিযোগের জোরেই আদালত বলে—“আইন যে রীতিতে প্রয়োগের কথা বলেছে, তা না মেনে কোনও ক্ষমতা প্রয়োগই হয় না।”
এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যদি কোনও সাধারণ নাগরিকের ঘরে দাঁত পাওয়া যেত, তিনি আজ জেলে থাকতেন। সরকার পুরো প্রশাসনকে ব্যবহার করেছে একজন অভিনেতার জন্য।”
আরও যোগ করেন, “আমরা গ্রামের মানুষকে ময়ূরের পালক রাখার জন্য তিরস্কার করি, অথচ এক সিনেমা তারকার ঘরে রাখা হাতির দাঁত বৈধ বলে গণ্য করি—এ কেমন ন্যায়বোধ!”
ওই মামলায় হাইকোর্টের বিচারপতি এ কে জয়শঙ্করন নাম্বিয়ার ও জোবিন সেবাস্টিয়ানের বেঞ্চ জানায়, “গেজেটে প্রকাশ না করায় ওই বিজ্ঞপ্তি ও মালিকানা শুরু থেকেই অবৈধ। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ আইনি নয়, সুবিধামতো।”
তবে আদালত তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্তির নির্দেশ দেয়নি। বরং বলেছে, সরকার চাইলে নতুন করে আইনসঙ্গত বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, কেরলে হাতি কেবল প্রাণী নয়—দেবতার প্রতীক, উৎসবের অংশ, সিনেমার প্রিয় চরিত্র। অথচ সেই রাজ্যেই প্রতি বছর রেকর্ড সংখ্যায় ঘটে মানুষ-হাতি সংঘর্ষ ও বন্দি হাতির নির্যাতন।
এক বন্যপ্রাণ গবেষক বলেন, “হাতির দাঁত শুধু বস্তু নয়, একসময়কার হত্যার স্মারক। সেলিব্রেটি যদি তা প্রদর্শন করেন, মানুষ মনে করে তা গৌরবের—এই বার্তাটাই ভয়ঙ্কর।”
এক পরিবেশ আইনের অধ্যাপক বলেন, “ভারতের বহু পরিবেশ আইন এভাবেই ভেঙে পড়ে, সরাসরি লঙ্ঘনে নয়, বরং ক্ষমতাবানদের সুবিধার্থে ‘প্রক্রিয়াগত ছাড়’ দিয়ে।” তাঁর কথায়, “এই রায় প্রমাণ করে, প্রক্রিয়াই ন্যায়বিচারের মেরুদণ্ড।”
এখন প্রশ্ন—কেরল সরকার কী করবে? নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করলে জনরোষ ও মামলা দুই-ই বাড়বে। না করলে আবার মামলা পুনরুজ্জীবিত হবে মোহনলালের বিরুদ্ধে।
এক বনকর্তা বলেন, “ফাইলটা কেউ ছুঁতে চায় না। ২০১১ সালেই যদি আইনকে চলতে দেওয়া হত, এত জটিলতা তৈরি হতো না।”