মঙ্গলবার সকালে বাজার খুলতেই সেনসেক্সে ৪০০ পয়েন্ট, নিফটি প্রায় ২৪,৮৫০ পয়েন্টে এসে ঠেকেছে।

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 17 June 2025 13:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষে দুদেশে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধার ছাড়াও বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত বিপদেরও অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। একদিকে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারে বিরাট ধস নেমেছে দেশে। মঙ্গলবার সকালে বাজার খুলতেই সেনসেক্সে ৪০০ পয়েন্ট, নিফটি প্রায় ২৪,৮৫০ পয়েন্টে এসে ঠেকেছে। এদিন সকালেই সেনসেক্সের পতন ঘটেছে ৪১৯.১৫ পয়েন্ট অথবা ০.৫১ শতাংশ। একদিনে ধসের পরিমাণ ৮১,৪৭১.৮৯। অন্যদিকে, নিফটি ১৩৬ পয়েন্ট পড়েছে যা ০.৫৪ শতাংশ। ২৪,৮৪৬.৪৫-এর নীচে।
শুধু এদেশেই নয়, এশীয় বাজার যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি, সাংহাইয়ের এসএসই কম্পোজিট এবং হংকংয়ের হাং সেং-এর বাজারেও লাল সতর্কতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই বিপদের বাইরে নেই। সেখানেও বাজার বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। একইভাবে অশোধিত তেলের বাজারের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড-এ জ্বালানি তেলের দাম ০.৫৩ শতাংশ বা ৭৩.৬২ ডলার ব্যারেলপ্রতি দাম হয়েছে।
ইজরায়েল-ইরানের এই সংঘর্ষ যখন গোটা বিশ্বকে আর্থিক দিক দিয়ে নাড়া দিয়েছে, তখন ভারতও তার বাইরে নেই। এই সংঘর্ষ চলতে থাকলে কিংবা তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়ালে দেশীয় বাণিজ্য, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়তে চলেছে, তারই ইঙ্গিত মিলেছে এদিনের সকালের শেয়ার বাজারে। ইরান ও ইজরায়েল দুই দেশই ভারতের বন্ধু হলেও তাদের দ্বন্দ্বে পিঠে ছোরা বসবে নয়াদিল্লিরই। বিশেষত জ্বালানি তেল, বাসমতী তেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আকাল দেখা দিতে পারে।
বাড়তে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি ভারতের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলবে জ্বালানি তেলে ও বাসমতী চালের রফতানিতে। পারস্য উপসাগরীয় এলাকার অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর ভারতের ৮০ শতাংশ জ্বালানি নির্ভর করে। ইরানি সীমান্তের কাছে একটি ছোট্ট খাঁড়ি হোরমুজ দিয়ে এই অধিকাংশ তেল আসে। সামরিক সংঘর্ষ বাড়লে কিংবা এই এলাকায় বাণিজ্য অবরোধ চালু হয়ে গেলে তা বন্ধ হয়ে যাবে। যাতে নয়াদিল্লির সমূহ ক্ষতি হবে। বিশ্বের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে এবং সেই সঙ্গে বাড়বে দেশের আমদানি খরচও।
বাস্তবে ২০১৯ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়েও এই একই কাণ্ড ঘটেছিল। জাহাজপ্রতি বিমা খরচ বেড়ে গিয়েছিল ২০ শতাংশ, যে কারণে তেলের দাম বেড়েছিল ৪-৫ শতাংশ। ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে প্রায় ১০.১ বিলিয়ন ডলারের (২০২৩)। অন্যদিকে, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে কিছুটা ছেদ পড়লেও শুকনো ফল, সার, ইউরিয়া রফতানিতে চুক্তি সচল রয়েছে। যুদ্ধ বাধলে এই দুই দেশেরই সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেবে।
সংঘর্ষ বৃদ্ধিতে ভারতের বাসমতী চাল রফতানিতেও বিরাট আকালের ছায়া দেখা দিয়েছে। বিশেষত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভারতীয় বাসমতী চালের বৃহত্তম খরিদ্দার হল ইরান। ২০২৪-২৫ সালে ইরান ভারত থেকে ৮.৫৫ লক্ষ টন। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৬,৩৭৪ কোটি। ভারত থেকে ইরানে ৩০-৩৫ শতাংশ বাসমতী চাল রফতানি হয়।
এই যুদ্ধের ফলে ইরানি ব্যবসায়ীদের লেনদের অন্তত ৬-৮ মাস বন্ধ হয়ে থাকবে। যার ফলে প্রত্যক্ষত ক্ষতি হবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের। এমনকী ইরানের আধা সরকারি সংস্থাও ৬ মাস পরে টাকা দিয়ে থাকে। এই অবস্থায় ভারতীয় চাল ব্যবসায়ীরা ইরানকে বাদ দিয়ে অন্য দেশে চাল চালানের চেষ্টা করছেন। তাতে লাভের পরিমাণেও থাবা বসছে।
ভারতের কৌশলগত স্বার্থ হল ইরানের কাছে চাবাহার বন্দর। এই বন্দরের জন্য ভারত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছে। ওমানের উপসাগরীয় এলাকায় অবস্থিত চাবাহার বন্দর হল আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ঢোকার ভারতের গেটওয়ে। এতে পাকিস্তানের সাহায্য ছাড়াই ভারত ওই অঞ্চলে যোগাযোগ রাখতে পারে।
তেল, চাল, অর্থনীতি, শেয়ার বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়াও ভারতের শিরে সংক্রান্তি রয়েছে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়েও। কারণ, এই যুদ্ধ গড়াতে শুরু করলে তার ভয়ানক প্রভাব পড়বে সমুদ্রের তলা দিয়ে যাওয়া কেবল নেটওয়ার্কে। বিশ্বের ৯৫ শতাংশ ইন্টারনেট ও ডেটা চলাচল ঘটে সমুদ্রের তলা দিয়ে যাওয়া কেবলের উপর নির্ভর করে। ইউরোপ ইন্ডিয়া গেটওয়ে, ফ্লাগ (ফাইবার-অপটিক লিঙ্ক অ্যারাউন্ড দ্য গ্লোব) এবং সি-মি-উই ৫ (সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডল ইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ ৫) কেবল গিয়েছে ইজরায়েল-ইরান এবং সংঘর্ষ এলাকা দিয়ে। যেমন- লোহিত সাগর, ওমান উপসাগর এবং হোরমুজ খাঁড়ির তলা দিয়ে। ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার যা মূল প্রাণস্পন্দন।
ইরান-ইজরায়েলের নৌশক্তির লড়াইয়ে এই সমস্ত কেবল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই এলাকার জলদস্যু বলে খ্যাত হুতি জঙ্গি গোষ্ঠী, ইরানের পক্ষে থাকায় তারা এই অমূল্য সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। আর তাহলে ভারতের অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। থেমে যাবে দেশের ব্যাঙ্কিং ও প্রতিরক্ষা যোগাযোগ।