৯২ বছরের অমর্ত্য সেন বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতা ও পর্যাপ্ত সময় নিয়ে হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে সেই শর্ত পূরণ হচ্ছে না।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।
শেষ আপডেট: 24 January 2026 15:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনী (SIR) নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তাঁর সতর্কবার্তা, এই প্রক্রিয়া ‘অযথা তাড়াহুড়ো’ করে চালানো হচ্ছে, যা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে গণতান্ত্রিক ভোটাধিকারকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বোস্টন থেকে সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৯২ বছরের অমর্ত্য সেন বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতা ও পর্যাপ্ত সময় নিয়ে হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে সেই শর্ত পূরণ হচ্ছে না।
অমর্ত্যের কথায়, যথেষ্ট সময় নিয়ে, সতর্কভাবে ভোটার তালিকার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে যা হচ্ছে, তা মোটেই সেরকম নয়। তিনি আরও বলেন, এসআইআর এমনভাবে তাড়াহুড়ো করে করা হচ্ছে যে ভোটাধিকার থাকা বহু মানুষ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের অধিকার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার সুযোগই পাচ্ছেন না। এটা ভোটারদের প্রতি যেমন অন্যায়, তেমনই ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতিও অবিচার।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অমর্ত্য সেন জানান, এই তাড়াহুড়োর চাপ নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের মধ্যেও স্পষ্ট। তাঁর কথায়, অনেক সময় মনে হয়, নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের কাছেও যথেষ্ট সময় নেই। তাঁরা যখন শান্তিনিকেতন থেকে আমার ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, যেখানে আমি আগেও ভোট দিয়েছি, যেখানে আমার নাম, ঠিকানা ও সব তথ্য সরকারি নথিতে রয়েছে, তখন আমাকে আমার মৃত মায়ের বয়স নিয়ে প্রশ্ন করা হল, আমার জন্মের সময় তাঁর বয়স কত ছিল। অথচ আমার মায়ের তথ্যও তাঁদের রেকর্ডেই রয়েছে।
অমর্ত্য সেন আরও বলেন, নথিপত্র সংক্রান্ত সমস্যাগুলি তাঁর একার নয়। গ্রামীণ ভারতে জন্ম নেওয়া বহু নাগরিকের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা অত্যন্ত সাধারণ। তাঁর কথায়, গ্রামীণ ভারতে জন্মানো বহু মানুষের মতোই আমারও কোনও জন্মসনদ নেই। ফলে ভোটাধিকার প্রমাণ করতে আমাকে অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিষয়টি মিটে যায়, তবু তিনি উদ্বিগ্ন সেই সব মানুষের কথা ভেবে, যাঁদের এমন সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, আমি বলতে পারি, বিটলসের গানের মতো, ‘Oh, I get by with a little help from my friends’। কিন্তু যাঁদের এত সহায়ক বন্ধু নেই, তাঁদের কী হবে? আমার বন্ধুরাই আমাকে নির্বাচন কমিশনের দরজা পেরোতে সাহায্য করেছেন। নবোতিপর অর্থনীতিবিদ জানান, নির্বাচন কমিশন তাঁর ও তাঁর মা অমিতা সেনের বয়সের পার্থক্য নিয়ে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা যুক্তিগত অসঙ্গতি দেখিয়ে তাঁকে শুনানির জন্য তলব করেছিল।
এসআইআর প্রক্রিয়া কোনও রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দিতে পারে কি না— এই প্রশ্নে অমর্ত্য সেন সরাসরি কোনও মত দিতে চাননি। তবে তিনি জোর দেন, গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য। তিনি বলেন, আমি কোনও ভোট বিশেষজ্ঞ নই, তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কিছু মানুষ বলেছেন, এর ফলে বিজেপি লাভবান হতে পারে। সেটা সত্য কি না জানি না। কিন্তু আসল বিষয় হল, নির্বাচন কমিশনের কোনও ভুল ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া উচিত নয় এবং কার লাভ হচ্ছে সেটা না দেখে আমাদের গর্বের গণতন্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ভুলের পথে ঠেলে দেওয়া ঠিক নয়।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ার ঝুঁকিতে কারা? সেই প্রশ্নে অমর্ত্য সেন স্পষ্ট করে বলেন, সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। নতুন ভোটার তালিকায় নাম তুলতে যে নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে, তা সমাজের প্রান্তিক মানুষের পক্ষে জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। এই নথিভিত্তিক শর্তের মধ্যেই এক ধরনের শ্রেণিগত পক্ষপাত আছে, যা স্বাভাবিকভাবেই গরিব মানুষের বিরুদ্ধেই কাজ করবে।