এসসিও সম্মেলনে (SCO Summit) শি জিনপিং (Xi Jinping) ও ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) সঙ্গে মোদীর (Narendra Modi) উষ্ণ সাক্ষাৎ, আমেরিকার শুল্ক যুদ্ধের (Trump Tariff War) প্রেক্ষাপটে ভারত-রাশিয়া-চিন ঐক্যের প্রদর্শন।

মোদী, পুতিন, জিনপিং।
শেষ আপডেট: 1 September 2025 11:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিনের তিয়ানজিনের এ বছরের এসসিও সামিট কেবল একটি সম্মেলনই নয়, ভূরাজনৈতিক বার্তার মঞ্চও বটে। সেই মঞ্চেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে যেভাবে হেসে কথা বললেন, হাত মেলালেন, এমনকি জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গনও করলেন, তাতে অনেকেই স্পষ্ট কূটনৈতিক সঙ্কেত দেখতে পাচ্ছেন। মনে করা হচ্ছে, আমেরিকার চাপের মুখে এশিয়ার এই তিন শক্তি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছে। মূলত রাশিয়ান তেল কেনার কারণ নিয়েই এর উৎপত্তি। এমন সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক যখন বেশ শীতল, ঠিক তখনই তিয়ানজিনে মোদী ও পুতিনের একসঙ্গে গাড়িতে চড়া, একসঙ্গে হাঁটা এবং পরক্ষণেই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত আলাপ, বিশ্ব কূটনীতিতে বড় বার্তা বহন করছে।
Interactions in Tianjin continue! Exchanging perspectives with President Putin and President Xi during the SCO Summit. pic.twitter.com/K1eKVoHCvv
— Narendra Modi (@narendramodi) September 1, 2025
গাড়ি থেকে নেমে মোদী ও পুতিন একসঙ্গে হাঁটে আসার পরে, মোদী, পুতিন ও জিনপিংয়ের একসঙ্গে কথা বলে, করমর্দন, হাসি-আলিঙ্গনের ভিডিও-ছবি ভাইরাল সারা দুনিয়ায়। তা দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন যতই চাপ দিক, ভারতকে তার দীর্ঘদিনের মিত্র মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে বাধ্য করতে পারবে না।
ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যে দেখা গেছে, পুতিন ও মোদী পাশাপাশি হাঁটছেন, আর তারপরই তারা গিয়ে যোগ দিলেন প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে। তিন নেতা একসঙ্গে আলাপ-হাসিতে মেতে উঠলেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের দেহভঙ্গি এতটাই স্বচ্ছন্দ ছিল যে, হয়তো আমেরিকাকেও ভাবতে হচ্ছে, আসলে কী নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছিল।
Always a delight to meet President Putin! pic.twitter.com/XtDSyWEmtw
— Narendra Modi (@narendramodi) September 1, 2025
শুধু তাই নয়, সামিটের সময়ে একটি গ্রুপ ফটো তোলার মুহূর্তে যখন মোদী ও পুতিন পাশাপাশি দাঁড়ালেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে পিছনে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, এক্ষেত্রে ছবিটি বেশ প্রতীকীভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা ও চিনের সঙ্গে নতুন সমন্বয় স্পষ্ট হল, আর পাকিস্তান রয়ে গেল প্রান্তিক অবস্থানে।
প্রাসঙ্গিকভাবে, এসসিও সম্মেলনের আগের দিনই মোদী ও শি ভারত-চিনের সীমান্ত সমস্যার সমাধানে যৌথ উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দেন। দুই নেতাই উল্লেখ করেন "ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য" সমাধানের কথা। শুধু সীমান্ত নয়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার দিকেও জোর দেওয়া হয়।
মোদীর বক্তব্যেও কূটনৈতিক সংযম স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমাদের সহযোগিতা ২.৮ বিলিয়ন মানুষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, যা মানবকল্যাণের পথ খুলে দিতে পারে।” এতে করে ভারতের ভূমিকাকে আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হল বলেও মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট শি-ও এই সম্মেলনে পরোক্ষভাবে আমেরিকার নীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে 'বিশৃঙ্খল' বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ভারত-চিনকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখানে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষও পরোক্ষভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মাথায় রাখা ভাল, আগামী বছর ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক ভারত। মোদীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে শি ইতিমধ্যেই আসবেন বলে জানিয়েছেন। এটি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত-চিন সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে, সীমান্ত সমস্যার মেঘ কাটিয়ে।
কূটনৈতিক মহল বলছে, এই এসসিও সম্মেলনে মোদী যেমন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিয়েছেন, ভারত চাপের কাছে নত হবে না, অন্যদিকে, চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে তিনি এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণেও ভারতের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন। ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধের পারদ যতই চড়ুক, তিয়ানজিনে মোদীর আচরণে স্পষ্ট, ভারত কেবল প্রতিরক্ষামূলক খেলায় নেই, বরং সক্রিয়ভাবে নতুন আন্তর্জাতিক ভারসাম্য গড়ার পথেও হাঁটছে।