সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ডিজিটাল অ্যারেস্ট (Digital arrest) শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, এটি দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।

গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 20 October 2025 17:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'গুরুতর উদ্বেগের বিষয়' বলে বর্ণনা করে 'ডিজিটাল অ্যারেস্ট' (digital arrest scam) সংক্রান্ত মামলায় সুয়ো মোটো পদক্ষেপ (Suo Moto cognizance) করল দেশের শীর্ষ আদালত। ১৭ অক্টোবর এই স্বতঃপ্রণোদিত মামলা নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)।
আম্বালার এক প্রবীণ দম্পতির দায়ের করা এক মামলার পর এই সিদ্ধান্ত নিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালতের নাম করে ভুয়ো নোটিস পাঠায় প্রতারকরা। নোটিসে বলা হয়, তাঁরা সিবিআই এবং ইডির তদন্তের আওতায় রয়েছেন। চিঠির সিল এবং সই একবারে আসলের মতো হওয়ায় ফাঁদে পড়তে বাধ্য হন ওই দম্পতি। খোয়া যায় ১ কোটিরও বেশি টাকা।
এই উদ্বেগজনক ঘটনাকে 'আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার উপর সরাসরি আঘাত' - এই ভাষাতেই বর্ণনা করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই বিষয়টির বিশেষ নজর রাখছে, কারণ ভুয়ো আদালতের আদেশে বিশ্বাস করে প্রতারকদের হাতে সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন।
বিচারপতি সূর্যকান্ত ও জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ বলেন, “বিচারকদের ভুয়ো স্বাক্ষর-সহ আদালতের আদেশ জাল করা ন্যায়বিচারের ভিত্তি নষ্ট করে। এমন অপরাধ কেবল প্রতারণা বা সাইবার অপরাধ নয়, এটি বিচারব্যবস্থার মর্যাদার ওপর সরাসরি আক্রমণ।”
সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক, সিবিআই, হরিয়ানা হোম ডিপার্টমেন্ট ও অম্বালা সাইবার পুলিশকে নোটিস পাঠিয়েছে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ভেঙ্কটরমণির সহায়তাও চেয়েছে।
কী এই ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’?
আইন অনুযায়ী এর কোনও সংজ্ঞা নেই, তবে এটি এক নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণা, যেখানে ভুয়ো সরকারি অফিসার সেজে মানুষকে ভয় দেখানো হয়।
প্রথমে প্রতারক ফোন বা ভিডিও কল করে নিজেদের পুলিশ, সিবিআই, ইডি বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার অফিসার পরিচয় দেন। তারা দাবি করে, ওই ব্যক্তির সিম, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পরিচয়পত্র অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে।
এরপর তারা ভুয়ো কোর্ট অর্ডার বা নথি পাঠায়, ভিডিও কলে ইউনিফর্ম পরে আসে, এমনকী ফেক এফআইআরের স্ক্রিনশট দেখায়। ধীরে ধীরে ভুক্তভোগীকে বিশ্বাস করিয়ে টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয় 'তদন্তের জন্য নিরাপদ অ্যাকাউন্টে'।
প্রতারকরা প্রায়শই বলে দেয়, 'আপনি বাড়ি থেকে বেরোবেন না বা কারও সঙ্গে কথা বলবেন না'। ফলে মানুষ মানসিকভাবে এক প্রকার ভার্চুয়ালি বন্দি হয়ে পড়েন।
সমস্যার জট ঠিক কোথায়?
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বান্ডি সঞ্জয় কুমার রাজ্যসভায় জানান, এনসিআরবি (NCRB) আলাদা করে ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ সংক্রান্ত তথ্য রাখে না, তবে জাতীয় সাইবার অপরাধ পোর্টালে (NCRP) রিপোর্ট করা মামলার তথ্য থেকেই প্রবণতা স্পষ্ট।
২০২২ সালে: ৩৯,৯২৫টি মামলা, ক্ষতি ৯১.১৪ কোটি টাকা
২০২৪ সালে: ১,২৩,৬৭২টি মামলা, ক্ষতি ১৯৩৫.৫১ কোটি টাকা
২০২৫ সালের প্রথম ২ মাসেই: ১৭,৭১৮টি মামলা, ক্ষতি ২১০.২১ কোটি টাকা
পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার ইতিমধ্যে ৩,৯৬২টি স্কাইপ আইডি, ৮৩,৬৬৮টি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট, ৭.৮১ লক্ষ সিম কার্ড ও ২,০৮,৪৬৯টি আইএমইআই নম্বর ব্লক করেছে। পাশাপাশি, ভারতের নম্বর থেকে এসেছে বলে মনে হয় - এমন আন্তর্জাতিক কল শনাক্ত করতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আদালত আগে কী বলেছে?
রাজস্থান হাইকোর্ট (জানুয়ারি): নিজ উদ্যোগে এই প্রতারণার ওপর মামলা নেয়। আদালত একে বলে “আইনি ভিত্তিহীন কিন্তু মানসিকভাবে ভয় ধরানো এক প্রতারণার কৌশল।”
দিল্লি হাইকোর্ট (সেপ্টেম্বর): ১.৭৫ কোটি টাকার প্রতারণায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তির আগাম জামিন খারিজ করে বিচারপতি অমিত মহাজন বলেন, “এই ধরনের অপরাধ ক্রমবর্ধমান এবং প্রযুক্তিকে অস্ত্র করে অপরাধীরা আইন এড়াচ্ছে।”
বম্বে হাইকোর্ট (মার্চ): ৭১ বছর বয়সি প্রাক্তন শিক্ষিকা লীলা পার্থসারথীর মামলায় কঠোর মন্তব্য করে আদালত বলে, পুলিশের দেরিতে অভিযোগ নেওয়া এবং সাইবার হেল্পলাইন ১৯৩০ অকার্যকর থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আদালত পুলিশকে জাতীয় সাইবার পোর্টাল ব্যবহার ও তহবিল ট্রেসিংয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
বিভিন্ন বয়সের মানুষই এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন, তবে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে বয়স্ক দম্পতিরা, যাঁরা ডিজিটাল দুনিয়া নিয়ে অতটাও সড়গড় নন, তাঁরাই এর শিকার হচ্ছেন বেশি। সুপ্রিম কোর্টের এই হস্তক্ষেপ ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা মোকাবিলায় এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, এই অপরাধ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, এটি দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।