বিজেপি শাসিত মূল জগন্নাথধামের রথ প্রচার ও জমায়েতের সংখ্যায় শেষ পর্যন্ত পিছনেই ফেলে দিল তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত দিঘার রথযাত্রাকে।

গোটা দেশ শুক্রবার সাক্ষী থাকল দুটি রথযাত্রাকে ঘিরে।
শেষ আপডেট: 27 June 2025 15:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘রথ ভাবে আমি দেব/ পথ ভাবে আমি/ মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী’। দেবত্ব ও দেবমহিমার প্রচার নিয়ে রবীন্দ্রদর্শনের এই কবিতা ছেলেবেলা থেকে অনেকেই পড়েছেন। এই ছত্রগুলি এখানে উল্লেখের প্রয়োজন এই কারণেই যে গোটা দেশ শুক্রবার সাক্ষী থাকল দুটি রথযাত্রাকে ঘিরে। রাজনীতির পথে নামলেন দুই রঙের জার্সি গায়ে একই জগন্নাথদেব। একজনের গায়ে ছিল গেরুয়া জার্সিতে পদ্মফুল আঁকা, তো মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন সবুজ জার্সি গায়ে ঘাসফুল আঁকা জগন্নাথ। লোকারণ্য, মহা আয়োজন সবই হল। কিন্তু, বিজেপি শাসিত মূল জগন্নাথধামের রথ প্রচার ও জমায়েতের সংখ্যায় শেষ পর্যন্ত পিছনেই ফেলে দিল তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত দিঘার রথযাত্রাকে। যদিও দেশের প্রায় সংবাদমাধ্যমের কাছেই এদিনটি ছিল রথযাত্রাকে ঘিরে অলিখিত-অঘোষিত রাজনৈতিক রশির টানাটানি।
জগন্নাথ এতদিন ছিল পুরীর জিআই ট্যাগ দেওয়া দেবতা। বাঙালির একমাত্র হাতের কাছের তীর্থস্থান। শুধু বাঙালি নয়, দেশজুড়ে ভক্ত সমাগম হয় পুরীর রথযাত্রায়। পুরীর জগন্নাথকে নিয়ে রয়েছে কয়েক সহস্র কল্পকাহিনি। বহু বাঙালির কাছে তা কণ্ঠস্থ। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাই বারবার ছুটে গিয়েছেন পুরীর মন্দিরে। সমুদ্রের প্রায় কাছে এই বিপুল ঐশ্বর্যশালী ও প্রাচীন সংস্কৃতি ও শিল্পের আধার জগন্নাথদেবের একজন অন্যতম ভক্ত তৃণমূল নেত্রী।
নতুন বিজেপি সরকার আসার আগে থেকেই মমতা বিজেডির নবীন পট্টনায়কের আমল থেকে পুরী যাত্রা করছেন। সেই থেকে তাঁরও মনে স্বপ্ন ছিল যে, কলকাতার কাছেপিঠে এরকম অনন্য সুন্দর মন্দির স্থাপন করে বাংলাতেও জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার স্থায়ী আবাস নির্মাণ করবেন। সেই মতো দিঘার সমুদ্রের ধারে শুরু হয়েছিল মন্দির নির্মাণ। পরে পরে তার উদ্বোধন এবং আজ, শুক্রবার হল দিঘার জগন্নাথের রথযাত্রার উদ্বোধন। যার সূচনায় রথের দড়ি টানলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে এবারেই প্রথম নয়, কলকাতায় ইসকনের রথেও বহুবার রশি টেনেছেন নেত্রী। তা নিয়ে সমালোচিতও হয়েছেন বিরোধী শিবির থেকে। যেমন এবারেও দিঘায় মন্দির নির্মাণ ও এদিন দড়ি টানা নিয়ে বিরোধী শিবির থেকে ভেসে এসেছে নানান তির্যক টিপ্পনি। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে নিজের কাজ, প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন তিনি।
ইতিমধ্যে দেশের ও ওড়িশার রাজনৈতিক রথের রং বদলে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখে লোকসভা ভোটে মুখ থুবড়ে না পড়লেও হার মেনেছে ইন্ডিয়া জোট। আর তার পরদিন থেকেই জোটের ঐক্য অনেকটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। দেশ জুড়ে একচেটিয়া গেরুয়া-হিন্দুত্ববাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পাশাপাশি, তারা বিরোধী দলগুলিকে হিন্দুবিরোধী ও মুসলিম তোষণকারী দল হিসেবে প্রচার শুরু করে। ওড়িশায় পাঁচ দশকের নবীন পট্টনায়কের দলের পতনের পাশাপাশি পুরী সংসদীয় কেন্দ্রটিও বিজেপির দখলে আসে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কৌশলী রাজনীতিতে পুরীর মন্দিরের আমূল সংস্কার সাধন হয়েছে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মতো পুরীর মন্দির চত্বর ঝাঁ চকচকে করে ফেলা হয়েছে। ফলে দর্শক বা পর্যটকের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। আর সেই হিন্দুত্ববাদীদের কৌশলকেই নিজ রাজ্যে ধর্মের সুদর্শন চক্রে মুণ্ডপাত করলেন তৃণমূল নেত্রী। বাঙালির কাছে আকর্ষণীয় করে তুললেন দিঘাকে, পাশাপাশি রথযাত্রার ঢলকে পুরীমুখী হওয়ার হাত থেকে পাশ কাটিয়ে দিঘাগামী করে দিলেন।
আগামী বছর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট। সেই ভোটের একবছরের কম সময় হাত রয়েছে। তার আগে দিঘার পথেও জগন্নাথদেবকে রথে চাপিয়ে ছুটিয়ে বিজেপির হিন্দুত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। দেশে রথযাত্রা চলছে। সব মুখ্যমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রের তাবড় নেতারা জনগণকে শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানিয়ে জগন্নাথ প্রণাম সেরেছেন সকালেই। তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী দিঘায় রথের দড়ি টেনে, বিধানসভা ভোটে বিজেপির ঢাক, কাঁসর, ভেঁপু বাজিয়ে হিন্দুত্বের বড়াই করার চাকার তলায় পাথর রেখে দিলেন। একই জগন্নাথের দুই রাজ্যে কী মহিমা!