এই প্রথম দিঘায় অনুষ্ঠিত হল রথযাত্রা। বলরাম, সুভদ্রা ও জগন্নাথের রথে মেতে উঠল দিঘা। সোনার ঝাড়ু হাতে আরতিতে অংশ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তদের ঢল, ত্রি-স্তরীয় নিরাপত্তায় মোড়া শহর।

দিঘায় রথযাত্রা।
শেষ আপডেট: 27 June 2025 15:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সমুদ্রের জোয়ারের গর্জন, রঙিন আলোকসজ্জা, কীর্তনের ছন্দ আর চন্দনের সুগন্ধ মিলে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল দিঘা। সমুদ্রের পাড়ে এই প্রথম আয়োজিত হল জগন্নাথদেবের মহারথযাত্রা।
বছরের পর বছর ধরে পুরীতে যে রথযাত্রা দেখতে ছুটে যান ভক্তরা, এবার সেই অভিজ্ঞতা মিলল পশ্চিমবঙ্গের এই জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে। উৎসবের জোয়ারে নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হল দিঘা, যার প্রতিটি অলিগলি এখন কীর্তনের ছন্দে মুখর।
সমুদ্র শহরের বুকে এই প্রথমবার গড়াল দেবত্রয়ীর রথ। কাঠের তৈরি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ যথাক্রমে ‘নন্দীঘোষ’, ‘তালধ্বজ’ ও ‘দর্পদলন’ রথে চড়ে ‘পাহান্ডি বিজয়’-এর মধ্য দিয়ে রওনা দিলেন মাসির বাড়ির উদ্দেশে।

উৎসব দেখতে ইতিমধ্যেই ভিড় উপচে পড়েছে দিঘার রাস্তায়। সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড়ে জমজমাট সৈকত। ছোট থেকে বড়, দেশ থেকে বিদেশ—সবাই মেতে উঠেছেন একসঙ্গে রথযাত্রার আনন্দে। দিঘার বুকে প্রথম এই রথযাত্রায় সামিল হয়েছেন কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হাজার হাজার মানুষ। ইসকন সদস্যরাও এসেছেন। আরও নানা দেশের মানুষের সমাগমের মুহূর্তের সাক্ষী দিঘা। মুছে গেছে দেশ সীমানার গণ্ডি। খোল-করতাল হাতে, শহরের রাস্তায় পা পা মিলিয়ে নাচের মাধ্যমে আরাধনায় সামিল সকলে। রঙিন সাজে বিশ্বের নানা প্রান্তের নারীপুরুষের ঝলমলে উপস্থিতিতে মেতে উঠেছে দিঘা শহর নিজেও।
এই বছরের শুরুতেই দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর এটাই প্রথম রথ উৎসব। তাই স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পর্যটক, সবাই অপেক্ষায় ছিলেন এক বিশেষ দিনের। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় পুজো।

তিনটি রথ পরপর সাজানো ছিল মন্দির চত্বরে। প্রথমে বলরামকে বসানো হয় রথে, এরপর সুভদ্রা এবং সবশেষে প্রভু জগন্নাথ। প্রতিটি দেবতাকে নির্দিষ্ট রীতি মেনে পুজো করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উপস্থিত ছিলেন এই মহোৎসবে।
পুজোর পর প্রথা মেনে পুরোহিতরা জগন্নাথদেবকে কাঁধে করে নাচতে নাচতে মন্দির থেকে বের করে রথে বসান। সেসময় তাঁর রথটি ঢাকা ছিল শাড়ি দিয়ে, যা আরতির পর খুলে দেওয়া হয়। দুপুর ২টোর সময় মুখ্যমন্ত্রী নিজ হাতে জগন্নাথের আরতি করেন। আর ঠিক ২:৩০ নাগাদ রথ রওনা দেয় মন্দির থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে ‘মাসির বাড়ি’-র উদ্দেশে।

মুখ্যমন্ত্রী নিজে অংশ নিয়েছেন রথের সামনে আয়োজিত বিশেষ আরতিতে। এরপর তিনি হাতে তুলে নেন সোনার ঝাড়ু, দেবতার যাত্রাপথ নিজে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করেছেন তিনি।

ভক্তদের যাতে টান দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হতে হয়, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। দুই পাশে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। যাঁরা রথের রশিতে টান দিতে চান, তাঁদের জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পথ রাখা হয়েছে। বহু জেলা থেকে আসা পুলিশ ফোর্স নিয়োজিত হয়েছে ভিড় সামলাতে। তিন স্তরের নিরাপত্তায় মোড়া হয়েছে দিঘা।

বৃষ্টি উপেক্ষা করেও বাড়ছে মানুষের ঢল। উৎসবের আবহে থেমে নেই কেউ। কীর্তন, ঢাকের আওয়াজ, রঙিন পতাকায় সেজে উঠেছে পুরো শহর। দিঘা যেন নিজেই এক নতুন ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠছে, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ আর ভক্তির স্রোত একসঙ্গে মিলেছে।
এই প্রথম দিঘা এমন এক মহোৎসবের স্বাদ পেল, যা শুধু ইতিহাসে নয়, মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।