দিনমজুর রাজেশের নিজের কোনও জমি নেই, নেই বাবা-মা, আইন নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। গরিব মানুষ, বস্তিতে থাকেন। একেবারে সোজাসাপটা সাধারণ মানুষ। আর এই মানুষটিই আজ এক ভাঙা ব্যবস্থার নির্মম শিকার।

রাজেশ বিশ্বকর্মা
শেষ আপডেট: 29 July 2025 18:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সদ্য জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন রাজেশ বিশ্বকর্মা (Rajesh Vishwakarma)। ভোপালের আদর্শ নগরে নিজের বাড়িতেই একপ্রকার ঘরবন্দি করে রেখেছেন নিজেকে। তাঁর মুখে কোনও অভিযোগ নেই, চোখে ক্ষোভ নেই, শুধু একরাশ বিষণ্ণতা আর কেমন যেন অবিশ্বাস। ১৩ মাস কাটিয়েছেন জেলে (Spent 13 months in jail)। অথচ কোনও অপরাধই নাকি তিনি করেননি। তাঁর ‘ভুল’ ছিল, তিনি একজন অসুস্থ মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
দিনমজুর রাজেশের নিজের কোনও জমি নেই, নেই বাবা-মা, আইন নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। গরিব মানুষ, বস্তিতে থাকেন। একেবারে সোজাসাপটা সাধারণ মানুষ। আর এই মানুষটিই আজ এক ভাঙা ব্যবস্থার নির্মম শিকার।
২০২৪ সালের ১৬ জুন, রাজেশ তাঁরই পাড়ার এক অসুস্থ মহিলাকে ডিআইজি বাংলোর কাছে একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা করিয়ে নিজের কাজে চলে যান। বিকেলে খবর আসে, সেই মহিলা মারা গিয়েছেন। পরদিন সকালেই রাজেশকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রাজেশ বলেন, 'ওই মহিলা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। আমি নিয়ে গিয়েছিলাম, এটুকুই। সন্ধেবেলা পুলিশ এল, কিছু জিজ্ঞেস করেই গ্রেফতার করল। বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কেউ শুনল না। বাড়ির লোককে জানাতে দেয়নি। নয় দিন থানায় রেখে, সোজা পাঠিয়ে দিল জেলে। উকিল রাখার টাকাও ছিল না আমার কাছে।'
যেই ঘরে ভাড়া থাকতেন, পুলিশ সেটি তালাবন্ধ করে দেয়। তিনি বাড়িছাড়া হয়ে যান। এখন ১৩ মাসের ভাড়া দিতে হবে, অথচ হাতে কোনও কাজ নেই। চারপাশের লোক বলছে, ‘ও তো জেল থেকে ফিরেছে।’ সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন রাজেশ। তিনি বলেন, 'আমি কোনও দোষ করিনি, তবু জেলে ছিলাম। এখন কেউ বিশ্বাস করে না। আমার সম্মানও গেছে, ভবিষ্যৎও গেছে।'
এই ১৩ মাস রাজেশ বিনা বিচারেই জেলে ছিলেন। এমনকী পরিবারের কেউ জানতেও পারেননি প্রথমে। তাঁর বোনও অনেক খোঁজাখুঁজি করেও জানতে পারেননি, ভাই কোথায়।
তিনি জানিয়েছেন, 'হঠাৎ একদিন বিকেলে ফোন করে জানায়, কোর্টে যেতে হবে। আমি একা ছিলাম, যেতে পারিনি। পরে গিয়ে দেখি ভাইকে নিয়ে গেছে। ও সব খুলে বলে। আধার কার্ড আর ফোন নিতে পুলিশ স্টেশনে গেলে ঘুরিয়ে দেয়, তারপর ৫০০ টাকা চায়। সেটা আমাদের জন্য খুব বড় অঙ্ক। পুলিশ যদি ঠিকমতো তদন্ত করত, এসব হত না।'
রাজেশের হয়ে লড়েছেন আদালতের তরফে নিযুক্ত আইনজীবী রীনা ভার্মা। তিনি জানান, 'রাজেশের নিজের পক্ষে কোনও উকিল ছিল না। আদালত আমাকে নিযুক্ত করে। আমরা চেষ্টা করি যাতে ন্যায়বিচার হয়। এরজন্য কোনও টাকা নেওয়া হয়নি।'
তদন্তে ভয়াবহ গাফিলতি ছিল বলেই অভিযোগ। রীনা ভার্মা বলেন, 'মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছিল, অসুস্থতার কারণে মৃত্যু। অথচ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লেখা হয়েছিল, শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ নেওয়াই হয়নি। মৃতার পরিচয়ও স্পষ্ট নয়। তাঁর গায়ে কী পোশাক ছিল, তা নিয়েও বিভ্রান্তি ছিল। তাহলে কী প্রমাণে রাজেশকে খুনি বলা হল? একেবারেই দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তদন্ত করা হয়েছিল।'
এই ঘটনা শুধু রাজেশের নয়। সরকারি তথ্য বলছে, দেশের জেলগুলিতে বন্দিদের ৭৫ শতাংশই বিচারাধীন, অর্থাৎ তাঁদের মামলার এখনও রায় হয়নি। শুধু মধ্যপ্রদেশেই, এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলে রয়েছেন এমন বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ৬ হাজার ১৮৫। রাজ্যের জেলগুলিতে ধারণক্ষমতার ১৬৪ শতাংশ বন্দি রয়েছেন। প্রতিবছর প্রতি বন্দির পেছনে খরচ হয় প্রায় ২৮ হাজার টাকা। এক থেকে তিন বছর ধরে যাঁরা জেলে আছেন, এমন বন্দির হার রাজ্যে ২৪ শতাংশ।
রাজেশ এখন মুক্ত, আদালত জানিয়ে দিয়েছে তিনি নির্দোষ। কিন্তু তাঁর হারানো সময় কে ফেরাবে? কাজ পাচ্ছেন না, সমাজেও জায়গা নেই। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, যে থানায় তাঁকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সেই পুলিশ স্টেশনের কেউ জবাবদিহি করতে হয়নি। তিনি বলেন, 'কে দেবে আমার সেই ১৩ মাসের দাম? কে ফিরিয়ে দেবে আমার পরিচয়, সম্মান?'