প্রতি বছর ভারতে ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষ রেবিসে (rabies) মারা যায় (stray dog bites), যা বিশ্বে মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশের সমান। অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট হয় না বা ভুল রোগ নির্ণয় হয়। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে।

পথকুকুরের বিপদ।
শেষ আপডেট: 14 August 2025 19:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্প্রতি দিল্লির রাস্তা থেকে পথকুকুরদের সরানো নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে বিতর্কে উত্তাল গোটা দেশ। পশুপ্রেমী মহল থেকে বড়সড় আপত্তি উঠেছে এই নিয়ে। সাধারণ মানুষদের একটা বড় অংশও দ্বিধাবিভক্ত। তবে বাস্তব তথ্য বলছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রতিনিয়ত কুকুরের কামড় (stray dog bites) এত বাড়ছে, তা এ দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় বিপদ হয়ে উঠেছে। এমনকি প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই বীভৎস ঘটনা।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এই বিপদের মুখে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা ও বয়স্করা, যারা শারীরিকভাবে একটু হলেও কমজোরি। এবং সেই সঙ্গে, যাঁরা খোলা আকাশের নীচে কাজ করেন। কুকুরের কামড়ের ট্রমা যে কেবল শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। সবচেয়ে বড় ভয় হল, জলাতঙ্কে (rabies) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। একবার এই উপসর্গ দেখা দিলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুই হয় রোগীর।
এই পরিস্থিতিতেই ১১ অগস্ট, দিল্লি-এনসিআর এলাকায় পথকুকুরের সংখ্যা কমানোর নির্দেশ দিয়েছিল দুই সদস্যের বেঞ্চ। তাদের নির্দেশ ছিল, যত দ্রুত সম্ভব সব পথকুকুরকে ধরে নির্দিষ্ট শেল্টারে স্থানান্তর করতে হবে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি তিন সদস্যের বেঞ্চ এই মামলার শুনানি শুরু করেছে। আদালত স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছে পথকুকুর সমস্যার জন্য।
জলাতঙ্ক বা রেবিস ভাইরাস 'লাইসাভাইরাস' গণভুক্ত। কোনও সংক্রমিত কুকুর কামড়ালে, তার লালায় থাকা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে সরাসরি স্নায়ুকোষে আক্রমণ চালায় এবং স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের দিকে এগোতে থাকে। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে কোনও উপসর্গ না দেখিয়েও সেই ভাইরাস শরীরে বৃদ্ধি পায় এবং শেষপর্যন্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) অনুযায়ী, একবার ভাইরাস মস্তিষ্কে পৌঁছালে এবং এর উপসর্গ দেখা দিলে, যেমন হাইড্রোফোবিয়া (জলের ভয়), বিভ্রান্তি, মাংসপেশির খিঁচুনি, প্যারালাইসিস-- এসবের পরে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য। ভাইরাসটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে লুকিয়ে থাকে, ফলে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ভারতে ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষ রেবিসে মারা যায়, যা বিশ্বে মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশের সমান। অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট হয় না বা ভুল রোগ নির্ণয় হয়। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে।
রেবিস হল এমন কয়েকটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগের একটি, যা কামড়ের পরে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কামড়ের পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়া সবচেয়ে ভাল এবং ডাক্তারি পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডোজ সম্পূর্ণ করাও জরুরি।
এদেশের হাসপাতালগুলিতে বর্তমানে যে আধুনিক জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, তার মধ্যে রয়েছে: Human Diploid Cell Vaccine (HDCV), Purified Vero Cell Rabies Vaccine (PVRV), Purified Chick Embryo Cell Vaccine (PCECV), INDIRAB (Vero cell-based, widely used post-bite), Rabivax-S, Rabipur, Abhayrab, Vaxirab N.
এগুলো নিরাপদ, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশার মানুষ যেমন ভেটেরিনারিয়ান ও প্রাণী সংস্পর্শে কাজ করা কর্মীদের জন্য প্রি-এক্সপোজার ভ্যাকসিনও ব্যবহার হয়।
গভীর বা একাধিক ক্ষত হলে, বা কামড়ের পরে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হলে Rabies Immunoglobulin ইঞ্জেকশন দেওয়া হতে পারে, যা শরীরে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, যতক্ষণ না ভ্যাকসিন কাজ শুরু করে।
ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও ভারতে রেবিসে মৃত্যুর হার বেশি। এর কারণ হল, সচেতনতার অভাব, চিকিৎসা পেতে দেরি, ভুল রোগ নির্ণয়, বা গ্রামীণ এলাকায় ভ্যাকসিনের ঘাটতি। মনে রাখতে হবে, পথকুকুরের কামড়ের পর বাঁচার মূল চাবিকাঠি হল, তৎক্ষণাৎ ক্ষতের মধ্যে সাবান ও জল দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ধোয়া, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, সম্পূর্ণ ভ্যাকসিন কোর্স সম্পন্ন করা।
এসবের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য প্রচেষ্টায় কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, রেবিসের একমাত্র কার্যকর প্রতিষেধক হল, দ্রুত টিকা দেওয়া।
ভারতে পথকুকুরের সংখ্যা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে বহু পরিবার এখনো রেবিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই শিক্ষা ও সচেতনতা ভ্যাকসিনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।