আট বছরের মধ্যে এত হারে কর মুকুবের ঘটনা আগে ঘটেনি। এতে সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে, এটা সত্যি কথা।

শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে দেশবাসীর কাছে আরও বেশি করে ঘরোয়া সামগ্রী ক্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন।
শেষ আপডেট: 18 August 2025 11:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যশুল্ক নীতির ইঁদুরদৌড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কর ছাঁটাই পদ্ধতির ফল কতটা সুদূরপ্রসারী হবে? তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আট বছরের মধ্যে এত হারে কর মুকুবের ঘটনা আগে ঘটেনি। এতে সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে, এটা সত্যি কথা। কিন্তু, শিল্প-বাণিজ্য মহল ও রাজনৈতিক ‘পণ্ডিত’রা বলতে শুরু করেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলতি বাণিজ্য সংঘর্ষে কর সংস্কার নীতিতে স্বয়ং মোদীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে চলেছে। মোটের উপর মার্কিন-ভারত শুল্কযুদ্ধের আবহে কোষাগারের ভাঁড়ার ক্ষয় হতে থাকলেও খোদ মোদীর দেবত্ব-ক্ষমতা দেশের মধ্যে আরও মহীয়ান হবে।
২০১৭ সালের পর এটাই হল দেশে বৃহত্তম কর সংস্কার। শনিবার মোদী সরকার জটিল গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স বা চলতি কথায় জিএসটি জমানার আমূল সংস্কারমুখী নীতি নিয়েছে। যার ফলে অক্টোবর থেকেই প্রতিদিনের ব্যবহার্য সামগ্রী ও ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য সস্তা হতে চলেছে। এতে একদিকে যেমন গ্রাহকরা অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন, তেমনই নেসলে, স্যামসাং ও এলজি ইলেকট্রনিক্স সরাসরি ফায়দা লাভ করবে।
একই সঙ্গে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে দেশবাসীর কাছে আরও বেশি করে ঘরোয়া সামগ্রী ক্রয়ের আবেদন জানিয়েছেন। যেমনটা ইদানীং দেশে শুরু হয়েছে যে, বয়কট মার্কিন পণ্য। বিশেষত গেরুয়াবাদী সংগঠনগুলি বিভিন্ন জায়গায় এ নিয়ে প্রচার সভা করে বেড়াচ্ছে।
দেশের অন্যতম রাজস্ব সংগ্রহের মেশিন হল জিএসটি। কর ছাঁটাইয়ের প্রস্তাবে স্বভাবতই রাজকোষে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ কমে যাবে। আইডিএফসি জানিয়েছে, এই ছাঁটাইয়ে দেশের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন ০.৬ শতাংশ চাঙ্গা হবে। কিন্তু এর ফলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বছরে ২০০০ কোটি ডলার মাশুল চোকাতে হবে।
তবে এতে দুর্বল স্টক মার্কেটকে দুরস্ত করবে। এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য যেমন বিহার বিধানসভা ভোটে মোদীকে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড দেবে। এই মত প্রকাশ করেছেন দিল্লির অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষক রশিদ কিদোয়াই। তিনি বলেন, জিএসটি কমানোয় সকলের উপরে প্রভাব পড়বে। আয়কর দেন দেশের ৩ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ। ফলে জিএসটি ছিল অন্যতম রাজস্ব সংগ্রহের রাস্তা। আসলে মোদী এটা করতে বাধ্য হয়েছেন মার্কিন নীতির চাপে।
তাঁর মতে, এই নীতিতে শেয়ার বাজারে সরাসরি সুপ্রভাব পড়বে। কারণ এখানে এখন অনেক খুচরো বিনিয়োগকারী থাকায় রাজনৈতিক দিক থেকে শেয়ার বাজার এই মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রসঙ্গত, গত ২০১৭ সালে জিএসটি প্রণয়ন করে কেন্দ্র দেশব্যাপী একটা অর্থনৈতিক সংস্কারের দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু, এর জটিল পদ্ধতির কারণে বিভিন্ন মহলে তা সমালোচিত হয়। কারণ এখানে ৫, ১২, ১৮ ও ২৮ শতাংশের চারটি স্তর তৈরি করা হয়।
নয়া নীতিতে ২৮ শতাংশের স্তরটি অবলুপ্ত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী। প্রায় অধিকাংশ সামগ্রীকেই ১২ শতাংশের স্তর থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। এতে অনেক বেশি উপভোক্তা উপকৃত হবেন এবং প্যাকেট করা খাবারের দাম কমে আসবে। সরকারি তথ্য বলছে, ২৮ ও ১২ শতাংশের জিএসটি দেশের বার্ষিক রাজস্বের ১৬ শতাংশ ঘরে তুলত। যার পরিমাণ গত আর্থিক বছরে ছিল ২৫,০০০ কোটি ডলার।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির অন্যতম হল বিহার। এই রাজ্যে জাতপাত থেকে বর্ণভিত্তিক, আর্থিকভাবে অগ্রসর থেকে অনগ্রসর সহ নানান ইস্যুতে স্থানীয়ভাবে একেকটি দলের একেক জায়গায় প্রভাব রয়েছে। VoteVibe নামে একটি এজেন্সির সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, বেকারি ও কর্মহীনতার ইস্যুতে এবার বিরোধীরা অনেক জোরাল অবস্থানে রয়েছে। Perfect Relations নামে একটি জনসংযোগ সংস্থার সহ প্রতিষ্ঠাতা ও কমিউনিকেশন কনসালট্যান্ট দিলীপ চেরিয়ান বলেন, যে কোনও রকমের কর মুকুব জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে এটা নিশ্চিত যে, এবার যা হয়েছে তা পুরোপুরি রাজনৈতিক লাভের গুড় ঘরে তোলার দিকে তাকিয়ে হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই ঘোষণাও হয়েছে এমন একটি দিনকে বেছে, যেদিন দেশের ঘরে ঘরে চলছে হিন্দুদের জাতীয় উৎসব। বিজেপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ কাজ করেছে বলে বিশ্বাস চেরিয়ানের। কারণ, ভারত-মার্কিন শুল্ক আলোচনার সব মাখনের হাঁড়িই ভেঙে গিয়েছে। শেষ পর্বের আলোচনার কথা ছিল আগামী ২৫-২৯ অগস্ট, তাও শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গিয়েছে।