পাঞ্জাবের গুরদাসপুর জেলা, যা প্রথম ভাগাভাগির খসড়ায় পাকিস্তানের দিকেই গিয়েছিল— শেষ মুহূর্তে চলে এল ভারতের দখলে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 15 August 2025 19:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মানচিত্রে একটুখানি রেখার হেরফেরই বদলে দিয়েছিল ভারতীয় ভূরাজনীতি। পাঞ্জাবের গুরদাসপুর জেলা, যা প্রথম ভাগাভাগির খসড়ায় পাকিস্তানের দিকেই গিয়েছিল— শেষ মুহূর্তে চলে এল ভারতের দখলে। এই পরিবর্তনের ফলে বেঁচে যায় জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে ভারতের একমাত্র স্থলপথ, পাঠানকোটের রাস্তা। এই পথ ছাড়া ১৯৪৭-এ কাশ্মীর দখল করা ভারতের কাছে প্রায় অসম্ভব ছিল, বলাবলি করেন বহু ইতিহাসবিদের।
প্রথম ভাগাভাগির নকশা: পাকিস্তানের দিকেই গুরদাসপুর
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৮ জুলাই, ১৯৪৭-এর ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাক্ট-এ ঠিক হয়েছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা যাবে পাকিস্তানে, আর অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা থাকবে ভারতের সঙ্গে। সেই সূত্রেই পাঞ্জাবের সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব পড়ে ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের হাতে। হাতে সময়— মাত্র পাঁচ সপ্তাহ।
১৯৪১ সালের জনগণনায় গুরদাসপুর জেলার মুসলিম সংখ্যা ছিল ৫১.১৪ শতাংশ। জেলার চার মহকুমার মধ্যে শুধু পাঠানকোট ছিল অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাকি তিনটি— শাকর্গড়, গুরদাসপুর, বটালা, এই সবই মুসলিম-অধ্যুষিত। প্রথম খসড়া অনুযায়ী, গোটা গুরদাসপুরই পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল।
শেষ মুহূর্তে পাল্টে গেল মানচিত্র
কিন্তু ১২ আগস্ট র্যাডডক্লিফের চূড়ান্ত পুরস্কার (Radcliffe Award) এলো অন্য রূপে— গুরদাসপুর, বটালা, পাঠানকোট গেল ভারতের দখলে, কেবল শাকর্গড় গেল পাকিস্তানে। র্যাডক্লিফ যুক্তি দিলেন, অমৃতসরের সেচের জন্য গুরদাসপুর ও বটালার খাল-হেডওয়ার্ক রক্ষা করা জরুরি ছিল। তবে ইতিহাসবিদ আলেস্টার ল্যাম্বের মতে, এই সিদ্ধান্ত সরাসরি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নীতি ভেঙেছিল।
নেহরু-মাউন্টব্যাটেনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
স্ট্যানলি ওলপার্ট (Shameful Flight) এবং ল্যাম্ব (Kashmir: A Disputed Legacy)— দুই ইতিহাসবিদই দাবি করেছেন, এই সীমানা বদলে দেওয়ার পেছনে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও ভারতের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রভাব ছিল। নেহরু, যিনি কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান, কাশ্মীরকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের জন্য অপরিহার্য মনে করতেন। পাঠানকোট–শ্রীনগর সড়ক না পেলে, ভারতের পক্ষে সামরিকভাবে কাশ্মীর দখল প্রায় অসম্ভব হত।
ল্যাম্বের দাবি, ৯ আগস্ট নেহরু মাউন্টব্যাটেনকে একটি চিঠি পাঠান, যাতে ভারতীয় সেচ বিশেষজ্ঞ এএন খোসলার নোট জুড়ে দিয়ে খালের গুরুত্ব বোঝানো হয়। পাকিস্তানি নেতারা অভিযোগ করেন, মাউন্টব্যাটেন চাপ প্রয়োগ করেছিলেন যাতে র্যাডক্লিফ ভারতকে গুরদাসপুর দেন।
কাশ্মীর সংকট ও যুদ্ধ
১৯৪৭-এর অক্টোবরে পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয় আক্রমণ (অপারেশন গুলমার্গ) শুরু হয় কাশ্মীরে। শ্রীনগর দখলের মুখে, মহারাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির দলিলে সই করেন। পরের মুহূর্তেই পাঠানকোট হয়ে ভারতীয় সেনা পৌঁছে যায় শ্রীনগরে। এই স্থলপথই হয়ে ওঠে পরবর্তী যুদ্ধের রসদ ও সৈন্য সরবরাহের প্রাণরেখা।
পাকিস্তানের অভিযোগ, গুরদাসপুর ভারতের হাতে যাওয়াই কাশ্মীর সমস্যার মূল। ভারতের তরফে বরাবরই দাবি করা হয়েছে, সিদ্ধান্তের কারণ ছিল সেচ ও রেলপথের বাস্তবতা, কোনও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়। তবে প্রমাণের ঘাটতি থাকলেও, গোপন নথি ও ঘটনার সময়কাল—সবই ইতিহাসবিদদের কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে।