এমন এক মন্তব্য সামনে এল যা ভারতের বহু বছরের দাবি, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো শুধু আশ্রয় নয়, পাক-রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পায় - সেটাকেই কার্যত শিলমোহর দিল।

শেষ আপডেট: 15 January 2026 21:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিস্তর অস্বীকার, কূটনৈতিক ধোঁয়াশা আর দ্বিচারিতার পর অবশেষে প্রকাশ্য মঞ্চে মুখ খুললেন লস্কর-এ-তইবার (LeT) শীর্ষ কম্যান্ডার হাফিজ আবদুল রউফ (Lashkar commander Hafiz Abdul Rauf confession)। স্বীকার করে নিলেন, ভারতের অপারেশন সিঁদুর অভিযান মুরিদকেতে থাকা লস্করের প্রধান ঘাঁটিতে ভয়াবহ ধাক্কা দিয়েছে (Operation Sindoor Lashkar admission)। যা তিনি নিজেই বর্ণনা করছেন “হেডকোয়ার্টার (Muridke HQ) ধ্বংস হয়ে যাওয়া” নামে, জানিয়েছেন মারকাজ-ই-তাইবা কমপ্লেক্স কার্যত গুঁড়িয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ৬-৭ মে রাতের সেই হামলার কথা বলতে গিয়ে রউফ বলেন, “এখন আর ওখানে আর কোনও মসজিদ নেই। আমরা সেখানে বসতেও পারি না। সব শেষ হয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে।” মার্কিন নিষিদ্ধ 'ঘোষিত' গ্লোবাল টেররিস্টের এই স্বীকারোক্তি, 'ভারতের লক্ষ্যবস্তু একদম ঠিক ছিল।'
লস্করের অপারেশনাল মুখ এই রউফ
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তান সেনার সহায়তাপ্রাপ্ত লঞ্চপ্যাড থেকে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতে ঢোকানোর দায়িত্বে বহুদিন ধরেই রয়েছে রউফ। সে কারণেই তার মুখে এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
শুধু তাই নয়, এর আগে ভারতীয় হামলায় খতম হওয়া লস্কর জঙ্গিদের জানাজা নেতৃত্ব দিচ্ছেন রউফ - সেই ছবিও ভাইরাল হয়েছিল। কয়েক মাস পর এবার তিনিই কার্যত পাকিস্তান ও লস্করের শেষ আড়ালটুকু উন্মুক্ত করে দিলেন।
অপারেশন সিঁদুরের কাহিনী
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা চালায় লস্কর-সমর্থিত সংগঠন, দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (TRF)। সেই হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন ভারতীয় নাগরিক-পর্যটক। তার পরই ভারত চালায় প্রতিশোধমূলক অপারেশন সিঁদুর।
তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারীদের হাতে ছিল চিনের তৈরি অস্ত্র ও সরঞ্জাম, যা পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীর সরঞ্জাম যোগানের ক্রমবর্ধমান পরিকাঠামোর দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এ বার স্বয়ং রউফও স্বীকার করলেন যে, লস্কর ও পাকিস্তান ওই সংঘর্ষে চিনা অস্ত্র ও ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করেছে।
পাকিস্তানের মদত রয়েছে, খোলাখুলি স্বীকার রউফের
স্বীকারোক্তির এখানেই শেষ নয়। আরও বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “পাকিস্তান জিহাদের জন্য খোলাখুলি স্বাধীনতা দিয়েছে। পৃথিবীর কোথাও জঙ্গি নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এত সহজ নয়।”
এটা এমন এক মন্তব্য যা ভারতের বহু বছরের দাবি, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো শুধু আশ্রয় নয়, পাক-রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পায় - সেটাকেই কার্যত শিলমোহর দিল। রউফ আরও বলেন, “রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই আমরা এটা করতে পারছি।”
পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে চিন
রউফ দাবি করেন, ‘বুনিয়ান-এ-মারসুস’ নামে যে পর্যায়ে ভারত-পাক উত্তেজনা বাড়ে, সেই সময় পাকিস্তানকে চিন রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে। তার বক্তব্য, চিনা যুদ্ধবিমান ও সরঞ্জামের এখন বিশ্বে চাহিদা রয়েছে, আর “অনেক দেশের বিমান নাকি এখন স্ক্র্যাপে পরিণত”।
রউফের এই মন্তব্য শুধু লস্করের অস্ত্রসজ্জা নয়, বেজিং-ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠতার দিকেও ইঙ্গিত করে।
ধ্বংস হওয়া কেন্দ্রেই জঙ্গিদের পাসিং-আউট প্যারেড
এই স্বীকারোক্তিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে একটি ঘটনা - চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি মুরিদকের সেই মারকাজ-ই-তাইবা কমপ্লেক্সেই নতুন জঙ্গিদের পাসিং-আউট অনুষ্ঠান হয়েছিল। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন রউফ, হাফিজ সইদের ছেলে হাফিজ তালহা সইদ, এবং লস্করের ডেপুটি চিফ সাইফুল্লাহ কাজুরি-সহ লস্করের শীর্ষ নেতৃত্ব।
অর্থাৎ, অপারেশন সিঁদুরের পরেও পাকিস্তানের মদতেই জঙ্গি পরিকাঠামো হয় পুনর্গঠিত হচ্ছে, নয়তো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে - এটাই প্রমাণ করে সেই অনুষ্ঠান।
‘আল্লাহ বাঁচিয়েছেন’ - রউফের রটনা
রউফের বক্তব্যে ছিল অভিযোগ, উচ্ছ্বাস, জঙ্গি মতাদর্শ - সব কিছুর মিশেল। ভারতের হামলার মাত্রা স্বীকার করেও তিনি বলেন,
“আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।”
তাঁর দাবি, পাকিস্তানের হাতে ছিল ভারত সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য “শেষ খুঁটিনাটি পর্যন্ত”, আর সংঘর্ষের প্রতিধ্বনি “আমেরিকা-ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছেছিল” - যা তিনি বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন।
NDTV-র ভিডিও ফাঁস করল পাকিস্তানের মুখোশ
NDTV যে ভিডিওটি সংগ্রহ করেছে, সেটি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অস্বীকারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। প্রথমবার পাকিস্তানের শীর্ষ জঙ্গি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন তাঁরা এখনও পাকিস্তানের ভেতরেই সুরক্ষিত ও সক্রিয়। এবার কোনও গোয়েন্দা রিপোর্ট নয়, পররাষ্ট্র দফতরের বিবৃতি নয়, স্বয়ং লস্কর কম্যান্ডারের মুখ থেকেই বেরল সত্যিটুকু - যা ইসলামাবাদের জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন প্রশ্ন তুলে দেবে, বলাই বাহুল্য।