বিধানসভায় জেডিইউ'র থেকে বেশি আসন থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২৫ বছর নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছে পদ্ম শিবির। নীতীশ রাজ্যসভায় চলে গেলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব পাবে বিজেপি (BJP)। হিন্দি বলয়ে একমাত্র বিহারেই বিজেপি জোট সরকারের শরিক ছিল। এবার তারাই সরকারের চালিকা শক্তি হবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া আরও একটি রাজ্যে এবার পুরোপুরি বিজেপি সরকার হতে চলেছে।

শেষ আপডেট: 5 March 2026 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আচমকাই মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)। স্বাস্থ্যের কারণে তিনি মাঝপথে সরে যেতে পারেন, এমন জল্পনা ছিল। তবে দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মাত্র চার মাসের মাথায় বিহারে সরকার প্রধানের পদ থেকে আচমকা সরে যাবেন, ঘনিষ্ঠজনেরাও তা আঁচ করতে পারেননি। বুধবার সকাল পর্যন্ত আলোচনা ছিল নীতীশের পুত্র জেডিইউ'র টিকিটে রাজ্যসভায় যাবেন। দুপুরের পর আলোচনা অন্য খাতে বইতে শুরু করে। জানা যায়, নীতীশ কুমার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজ্যসভায় যাচ্ছেন। ফলে বিহারে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে।
বিধানসভায় জেডিইউ'র থেকে বেশি আসন থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২৫ বছর নীতীশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছে পদ্ম শিবির। নীতীশ রাজ্যসভায় চলে গেলে বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব পাবে বিজেপি (BJP)। হিন্দি বলয়ে একমাত্র বিহারেই বিজেপি জোট সরকারের শরিক ছিল। এবার তারাই সরকারের চালিকা শক্তি হবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া আরও একটি রাজ্যে এবার পুরোপুরি বিজেপি সরকার হতে চলেছে।
বিহারের রাজনৈতিক মহলে এখন অন্যতম আলোচ্য নীতীশ কুমার রাজ্যসভায় যাওয়ার সুবাদে পুনরায় জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে গেলে রাজ্যে বিজেপি এবং জেডিইউ'র ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াবে। উচ্চবর্ণ এবং বণিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত বিজেপি বিহারে পায়ের তলায় নিম্নবর্গের মানুষের সমর্থন পেয়েছিল নীতীশ কুমারের সঙ্গে বোঝাপড়ার সুবাদে। নীতীশ তাঁর স্বজাতি কুর্মিদের সংগঠিত করে ইবিসি বা অতিপ্রশ্চাত্পদ শ্রেণির যে ভোট ব্যাংক গড়ে তুলেছেন সেটাই বিহারে বিজেপি-জেডিইউ জোটের নির্বাচনী ভাগ্য গড়ে দিচ্ছিল। নীতীশ মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে গেলে ইবিসি ভোটব্যাঙ্ক কতদিন অক্ষত থাকবে তা নিয়ে সংশয় আছে। নীতীশ নেতৃত্বে না থাকলে নিম্নবর্গের মানুষ বিজেপিকে ভোট দেবে কিনা প্রশ্ন আছে তা নিয়েও। ফলে নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার ফলে বিজেপি এবং জেডিইউ, দুই দলের সামনেই নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকেই মনে করছেন নীতীশকে সামনে রেখে উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের ভোটারদের মধ্যে যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তৈরি হয়েছিল তা আগামী দিনে ভেঙে যেতে পারে।
ইতিমধ্যে জেডিইউ'র দুই শীর্ষ নেতা জাতীয় কার্যকরী সভাপতি সঞ্জয় ঝাঁ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব রঞ্জন ওরফে লালন সিং'কে নিয়ে দলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। উচ্চবর্ণের এই দুই নেতা বিজেপি সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলছেন এবং তারাই পদ্ম শিবিরের হাতে মুখ্যমন্ত্রিত্ব তুলে দিতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে নীতীশের দলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নীতীশ সরে যাওয়ার পর বিহারের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হতে পারেন? বিজেপিতে দুটি নাম নিয়ে আলোচনা বেশি। যদিও প্রত্যাশীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ। যে দু'জনকে নিয়ে চর্চা বেশি তাদের একজন সম্রাট চৌধুরী নীতীশের মন্ত্রিসভার পর পর দু'বার উপ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অতি পশ্চাদপদ কৈরি সম্প্রদায়ের মানুষ। কৈরিরা বিহারে ওবিসি ক্যাটিগরির অন্তর্ভুক্ত। নীতীশের স্বজাতি কুর্মিদের সঙ্গে কৈরিদের সদ্ভাব রয়েছে।
বিজেপিতে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় যে নামটি নিয়ে আলোচনা চলছে তিনি হলেন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। তিনি যাদব সম্প্রদায়ের মানুষ। বিহারে যাদবদের সিংহভাগ লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি'র সমর্থক। তাছাড়া সামাজিকভাবে নীতীশ কুমারের অতি পিছড়া বা ইবিসি ভোটারদের সঙ্গে কুর্মি, কৈরিদের সংঘাত আছে। ফলে জাত সমীকরণের অঙ্কে নিত্যানন্দ রাই কিছুটা হলেও পিছিয়ে আছেন সম্রাট চৌধুরীর তুলনায়। তবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপিতে আরও তিন-চারটি মুখ নিয়ে কথা চলছে।
চর্চা চলছে আরও একটি বিষয় নিয়ে। তা হল বিজেপির সমর্থনে সরকার চালালেও নীতীশ কুমার পদ্ম শিবিরকে হিন্দুত্বের এজেন্ডা নিয়ে খুব বেশি সক্রিয় হতে দেননি। বিজেপি মুখ্যমন্ত্রিত্ব হাতে পাওয়ার পর তারা হিন্দুত্বের এজেন্ডা নিয়ে এগবে বিহারে, এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তখন নীতীশের দলের সঙ্গে পদ্ম শিবিরের বোঝাপড়া কতদিন টিকবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। তাছাড়া বিজেপির সঙ্গে ইতিমধ্যে ঘর করা একাধিক দল রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পঞ্জাবে অকালি দল, গোয়ায় মহাষ্ট্রবাদী গোমন্তক দল, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা। এই দলগুলি দীর্ঘদিন এনডিএ'র শরিক ছিল। এখন বিজেপির সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। মহারাষ্ট্রে বিজেপি প্রথমে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে সরকার গড়ার সুযোগ দিয়েছিল। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনের পর শিন্ডে আর মুখ্যমন্ত্রিত্ব ফিরে পাননি। এখন দেখার বিহারে নীতীশ কুমারের জেডিইউ'র ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়। বিজেপি নিম্নবর্গের ভোট ধরে রাখতে পারে কিনা তা নিয়েও কৌতূহল আছে।