২৬ জন পর্যটকের যে বলি জঙ্গিরা চড়িয়েছিল, সেই ভূস্বর্গে এখনও প্রাণ ফেরেনি রাজ্যের মানুষের প্রাণস্পন্দন পর্যটন ব্যবসায়।

গুলমার্গ বা ফুলের উপত্যকা এবং সোনামার্গ বা সোনার তৃণভূমি ঢেকেছিল শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে।
শেষ আপডেট: 6 November 2025 13:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পহলগামে জঙ্গি হানার রক্তাক্ত ক্ষতে কিছুটা হলেও মলম লাগিয়েছিল অপারেশন সিঁদুর। ভারত-পাকিস্তানের সেই মিনিযুদ্ধের ৬ মাস কাটল। কিন্তু, ২৬ জন পর্যটকের যে বলি জঙ্গিরা চড়িয়েছিল, সেই ভূস্বর্গে এখনও প্রাণ ফেরেনি রাজ্যের মানুষের প্রাণস্পন্দন পর্যটন ব্যবসায়। পুজোতে বিপুল লোকসান কাটিয়ে এখন কাশ্মীরের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের স্থানীয়রা তাকিয়ে আছেন আসন্ন বিয়ের মরশুম ও শীতের দিকে তাকিয়ে। প্রতিবছর সুন্দরী কাশ্মীরের বরফের স্বাদ নিজে চোখে চেখে দেখতে ভিড় জমান নববিবাহিত দম্পতিরা। তাঁদের মধুচন্দ্রিমার কোলাহল এবং বছর শেষের ছুটি কাটাতে বহু মানুষ আসেন কাশ্মীরে। অপারেশন সিঁদুরের অর্ধেক বছর পার করে স্থানীয়রা এখন সেই আশাতেই বুক বেঁধে রয়েছেন।
স্থানীয়দের সেই আশায় বরফ ঢেলেছে দুদিন আগের তুষারপাত। দুটি বিশ্বখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র গুলমার্গ বা ফুলের উপত্যকা এবং সোনামার্গ বা সোনার তৃণভূমি ঢেকেছিল শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে। যা এই উপত্যকা দুটির মানুষের মনে আবার নতুন করে বাঁচার রসদ জুগিয়েছে। হাওয়া অফিসের খবর বলছে, এই সপ্তাহ জুড়েই বরফ পড়তে পারে। পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত ব্যবসায়ীদের কথায়, আগে আগে বরফ পড়া খুবই ভাল ইঙ্গিত।
এর আগে মরশুমের প্রথম বরফ পড়েছিল বিজয়ার রাতে। বারামুল্লা জেলার গুলমার্গ প্রথম তুষারপাতে ঢেকে গিয়েছিল। পর্যটন ব্যবসায় যুক্তরা জানান, এত আগে তুষার পড়াটা খুবই আশাব্যঞ্জক। এতে ভ্রমণার্থীদের ভিতর উৎসাহ গড়ে তুলবে। সাত তাড়াতাড়ি শীতকাল চলে এলে পর্যটকের ঢল ফের উপচে পড়বে বলে আশায় বুক বেঁধেছেন উপত্যকার ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেন, এই তুষারপাতেই আবার বুকিং শুরু হয়ে যাবে। এবার বিপুল সংখ্যায় পর্যটকের পায়ের চিহ্ন পড়বে। কয়েক মাসের অনিশ্চয়তার অন্ধকার কাটিয়ে দিল এই হিমপ্রপাত।
প্রতিবছরই বরফে ঢাকা কাশ্মীর দেখতে প্রচুর সংখ্যায় পর্যটন আসেন। এর মধ্যে বিদেশির সংখ্যা অগুনতি। তাই ব্যবসার ঝাঁপি খোলার আগেই এই খবর নতুন অধ্যায় শুরু করবে বলে জানান এক হোটেল মালিক। পহলগামে হানার পরেই সরকার বেতাব ও আরু ভ্যালি বন্ধ করে দেয়। তার অনেক দিন পরে পর্যটন কেন্দ্রগুলি খুলে দেওয়া হলেও পুজোয় তেমন একটা পসরা হয়নি।
শ্রীনগরে থাকা এক ট্যুর অপারেটর বলেন, গুলমার্গ-সোনামার্গে বরফ পড়ার খবর ছেয়ে গিয়েছে। এটা একটা বিরাট শুভ সংকেত। কাশ্মীরের অন্যতম আকর্ষণই হল স্কি, স্নো বোর্ডিং ও শীতকালীন ট্রেকিং। তা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে এই খবরে। গোটা পর্যটন শিল্প এমনই একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। ওয়াসিম আহমেদ নামে সোনামার্গের এক পর্যটক অপারেটর বলেন, এটাই নভেম্বরের প্রথম তুষারপাত। গান্ডেরবালের অপারেটর বিলাল আহমেদের কথায়, এর মধ্যেই পর্যটকরা যোগাযোগ শুরু করেছেন। বরফ পড়ার খবর পাওয়া মাত্রই গ্রাহকরা অগ্রিম বুকিংয়ের জন্য ফোন করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বরফের ছবি দেখেই অনেকেই আসার উৎসাহ প্রকাশ করছেন।
টাট্টু ঘোড়ার মালিক হাসান বলেন, তুষারপাত মানেই আমাদের কাজ পাওয়া। ইরশাদ নামে এক কাওয়া বিক্রেতা জানান, এবার বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছি। কাশ্মীরের পর্যটন ব্যবসায় জোয়ার আনতে আরও অগ্রগতি ঘটেছে। অতি সম্প্রতি জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ জম্মু-কাশ্মীর সরকারকে পহলগামের বৈসরণে কেবল কার প্রকল্পে নিরাপত্তা অনুমতি দিয়েছে। এই বৈসরণেই পর্যটকদের উপর হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। তারপর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার মিলে এখানে একটি কেবল কার বা রোপওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। এতদিন এখানে ঘোড়ার পিঠে বা হেঁটে যেতে হতো। এই কেবল কার প্রকল্পের আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ১২০ কোটি টাকা।
সরকার এনআইএ-র কাছে নিরাপত্তাজনিত বিষয়টি খতিয়ে দেখার আর্জি জানিয়েছিল। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অনুমোদনের ফলে কাশ্মীর পর্যটনে আরও গতি আসবে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বিধানসভায় জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই একটি কোম্পানিকে প্রকল্পটি তুলে দেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীর কেবল কার কর্পোরেশন পহলগামের যাত্রীনিবাস থেকে মিনি সুইৎজারল্যান্ড বলে পরিচিত বৈসরণের তৃণভূমি অঞ্চল পর্যন্ত ১.৪ কিমি পথ বাছাই করেছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি ৯.১৩ হেক্টর বনাঞ্চলের উপর দিয়ে যাবে। কাজ শুরু হওয়ার দেড় বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।