স্টার্টআপ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, আইন সংস্কার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০২৫ সালে কীভাবে মোদী সরকার ভারতের অর্থনীতিকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাচ্ছে, তা বিশদে ব্যাখ্যা করলেন পীযূষ গোয়েল।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 21 January 2026 00:09
নতুন বছর ভারতের শিল্প-বাণিজ্য চালচিত্রে নতুন আত্মবিশ্বাস ও আশার সঞ্চার করেছে। ২০২৫ সালে যেসব নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতির সঞ্চার করবে, ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপ-গুলিকে বিশ্ব বাজারের নাগাল এনে দেবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রা সহজ করার যে প্রয়াস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিয়েছেন, তাকে আরও এগিয়ে দেবে।
স্টার্টআপ-গুলিকে উৎসাহ দেওয়া মোদী সরকারের এক প্রধান উদ্যোগ। আজ ভারতে ২ লক্ষেরও বেশি সরকার-স্বীকৃত স্টার্টআপ রয়েছে। স্টার্টআপ ইন্ডিয়ার দশম বর্ষপূর্তিতে তাই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের স্টার্টআপ-গুলি বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করছে এবং ভারতীয় অর্থনীতিকে আরও সুস্থিত ও স্বনির্ভর হতে সাহায্য করছে।
অর্থনৈতিক বিকাশের গতি বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনের মানোন্নয়নের যে বৃহত্তর কৌশল মোদী সরকার নিয়েছে, স্টার্টআপ-গুলিকে উৎসাহ দেওয়া তারই অঙ্গ।
২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সুদৃঢ় নেতৃত্বে ভারতের যে রূপান্তর যাত্রা চলছে, ২০২৫ সাল তার এক মাইলফলক। বিভিন্ন সাহসী সিদ্ধান্ত ও যুগান্তকারী সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের সরকার ব্যবসার পরিবেশকে নতুন রূপ দিয়েছে। এর পাশাপাশি, প্রতিটি নীতি যাতে নাগরিকদের, বিশেষত প্রান্তিকতম মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটায়, তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারত আজ বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু এবং এক নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত অংশীদার। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতের মোট রপ্তানী ৬ শতাংশ বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে ৮২৫.২৫ বিলিয়ন ডলারে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। রপ্তানীকারকদের পাশে দাঁড়াতে সরকার ২৫ হাজার ৬০ কোটি টাকার রপ্তানী প্রসার মিশনের ঘোষণা করেছে।
জনবিশ্বাস এবং সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ:
২০২৫ সালের রিপিলিং অ্যান্ড অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ৭১টি সেকেলে আইন বাতিল করেছে, এর মধ্যে কিছু আইন ১৮৮৬ সালেরও আগেকার। জনবিশ্বাস উদ্যোগের আওতায় মোদী সরকার বহু ছোটখাটো অপরাধকে ফৌজদারি অপরাধের আওতা থেকে বাদ দিয়েছে। এই সংস্কারগুলি শাসন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করেছে এবং ভারতের আইনি কাঠামোকে আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করেছে। এই বছরেও এমন আরও কয়েকশো আইনকে পর্যালোচনার আলোচনায় রাখা হয়েছে।
গত বছর সংসদের বাদল অধিবেশনে জাহাজ ও বন্দর সংক্রান্ত ৫টি যুগান্তকারী বিল পাশ হয়েছে। এই আইনগুলি নথিপত্র রাখার বিধি ও বিবাদ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে এবং লজিস্টিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্য মহানির্দেশনালয় স্বচ্ছ ও সহায়ক নীতির মাধ্যমে রপ্তানীকারকদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে, ব্যবসা করা আরও সহজ হয়ে উঠছে।
এই উদ্যোগগুলি আমাদের ব্যবসায়ী ছোট উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ-গুলির মনোবল বাড়িয়েছে। তাঁরা এখন বিধিগত বাধ্যবাধকতার খুঁটিনাটি পালন বা ছোটখাটো ভুলের জন্য জেলে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও ‘লোকাল ফর গ্লোবাল:
ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কৌশলের একটি মূল নীতি হ’ল – স্থানীয় উদ্যোক্তা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্টার্টআপ, কৃষক ও কারিগরদের সমর্থন যোগানো এবং তাঁদের বিশ্বমঞ্চে সফল হয়ে উঠতে সক্ষম করে তোলা। এই ভাবনা থেকে গত বছর ভারত ৩টি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে, ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ড ও ওমানের মতো উন্নত বাজারে ভারতীয় পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুনিশ্চিত হয়েছে।
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলিও সংস্কার প্রক্রিয়ার অঙ্গ। আগে ইউপিএ সরকার জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এমন সব দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করত, যারা বিশ্ব বাজারে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। মোদী সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সঠিকভাবে উন্নত দেশগুলির সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং পারস্পরিক লাভজনকতা নিশ্চিত করেছে।
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলি কর্মসংস্থানের সুযোগ ও বিনিয়োগ বাড়াবে। সারা দেশের ছোট ব্যবসা, পড়ুয়া, মহিলা, কৃষক ও যুবসমাজের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। প্রতিটি চুক্তির আগেই সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে, যাতে ভারসাম্যপূর্ণ ফলাফল ও লাভজনকতা সুনিশ্চিত হয়।
ভারতের স্বার্থ রক্ষা:
এই চুক্তিগুলি ছাড়াও সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও লিকটেনস্টাইন’কে নিয়ে গঠিত ইউরোপীয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি কার্যকর করা হয়েছে। এই সবকটি চুক্তিতেই ভারতের কৃষি ও ডেয়ারী ক্ষেত্রের স্বার্থ সুরক্ষিত রয়েছে। এমনকি, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বের বৃহৎ ডেয়ারী রপ্তানীকারক দেশগুলির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এইসব বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে ভারতীয় রপ্তানীকারকরা অন্য দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ পাচ্ছেন, ভারতের নিজস্ব বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রক্রিয়াও ক্রমশ গতি পাচ্ছে। আগামী ১৫ বছরে নিউজিল্যান্ড ভারতের বাজারে ২০ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এই বিনিয়োগ কৃষি, ডেয়ারী, এমএসএমই, শিক্ষা, ক্রীড়া ও যুব কল্যাণে সহায়ক হবে, ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশের পথ প্রশস্ত হবে।
ভারত: বিশ্বের বিনিয়োগ গন্তব্য
২০২৪-২৫ পর্যন্ত গত ১১টি আর্থিক বছরে ভারতে ৭৪৮ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা তার আগের ১১ বছরের ৩০৮ বিলিয়ন দলারের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
এই পরিসংখ্যান আরও বেশি করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যদি আমরা মনে করি যে, মোদী সরকার এমন এক অগোছালো অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, যাকে বিশ্বের ‘ফ্র্যাজাইল ফাইভ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হ’ত। ইউপিএ শাসনকালে একের পর এক অর্থনৈতিক ধাক্কা অব্যাহত থাকায় উন্নত দেশগুলি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় আগ্রহী হ’ত না। সুনির্দিষ্ট, দুর্নীতিমুক্ত শাসন, সাহসী সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলাসাধনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতীয় অর্থনীতির উপর আস্থা ফিরিয়েছেন এবং ভারত’কে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পছন্দের গন্তব্যে পরিণত করেছেন।
দরিদ্র সহায়ক সংস্কার:
জাপান’কে পেছনে ফেলে ২০২৫ সালের শেষে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে ভারতীয় অর্থনীতি জার্মানীকেও ছাপিয়ে যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল – ইউপিএ আমলের বিপ্রতীপে এক্ষেত্রে সংস্কারের সুফল দরিদ্রতম মানুষের কাছে, বিশেষত গ্রামীণ ভারতে পৌঁছেছে।
শ্রমিক কল্যাণে মোদী সরকার শ্রম ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সংস্কারসাধন করে ২৯টি বিচ্ছিন্ন আইনকে ৪টি আধুনিক বিধিতে সংগ্রথিত করেছে। ন্যায্য মজুরি, সময়মতো মজুরি প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এরফলে, শ্রম শক্তিতে মহিলাদের অংশগ্রহণও ব্যাপকভাবে বাড়তে চলেছে।
জিএসটি সংস্কারের ফলে এখন সুস্পষ্ট দ্বিস্তরীয় কাঠামো রয়েছে। এর সুফল প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকই ভোগ করছেন। এতে পরিবার, এমএসএমই, কৃষি ও শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রগুলির উপর চাপ কমবে।
সামনের পথ:
২০২৫ সালটি ছিল সেতুবন্ধনের – দেশীয় সংস্থা ও বিশ্ব বাজারের চাহিদার মধ্যে; নীতিগত সংস্কার ও ডিজিটাল ক্ষমতায়নের মধ্যে এবং বিকাশমুখী ছোট ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে।
ভবিষ্যতের ঝুলিতে আরও অনেক কিছু রয়েছে। নীতি আয়োগের সদস্য শ্রী রাজীব গওবার নেতৃত্বে একটি প্যানেল বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংস্কার কর্মসূচি পর্যালোচনা করছে। এই উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংস্কার এক্সপ্রেসের গতি আরও বাড়াবে। দ্রুতগতিতে আগুয়ান ভারতের সামনে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে, তা হ’ল – প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য, উদ্ভাবনী শিল্প এবং আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভর ও প্রাণবন্ত অর্থনীতি নিয়ে এক বিকশিত ভারত গড়ে তোলা। ভারতের রপ্তানীকারক, উৎপাদক, কৃষক এবং পরিষেবা প্রদানকারীদের সাফল্যই জাতির সাফল্য।
ভারত শুধু ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতই হচ্ছে না, তার রূপও দিচ্ছে। সুদৃঢ় নেতৃত্ব, সাহসী সংস্কার এবং স্পষ্ট বিশ্বজনীন কৌশলের মাধ্যমে দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দেওয়া হচ্ছে। ভারত যখন বিশ্বে বাণিজ্য করছে, নির্মাণ করছে, উদ্ভাবন করছে, অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে - তখন এক শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও বিশ্বস্ত দেশ হিসেবে নিজস্ব শর্তেই তা করছে।
লেখক কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত।