স্বাভাবিক শীতের চেহারা থেকে অনেক দূরে এই দৃশ্য। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, চাষ এবং শীতকালীন (Winter Vanishing) পর্যটনের উপর।

‘দেবভূমি’র পাহাড় তুষারহীন, শুষ্ক!
শেষ আপডেট: 20 January 2026 18:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) পাহাড়ে এ বার যেন শীতই হারিয়ে গিয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর কেটে গিয়েছে এক ফোঁটা বৃষ্টি বা একমুঠো তুষারপাত (Snow fall) ছাড়াই। জানুয়ারির অর্ধেকের বেশি পেরিয়ে গেলেও স্বস্তির কোনও ইঙ্গিত নেই। ওম পর্বত, আদি কৈলাসের (Kailash) মতো দুর্গম উচ্চশৃঙ্গ থেকে শুরু করে কেদারনাথ (Kedarnath), বদ্রীনাথ (Badrinath), মুন্সিয়ারি— সর্বত্রই চোখে পড়ছে খালি, বিবর্ণ পাহাড়। স্বাভাবিক শীতের চেহারা থেকে অনেক দূরে এই দৃশ্য। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, চাষ এবং শীতকালীন (Winter Vanishing) পর্যটনের উপর।
শীত ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনও সাময়িক ব্যতিক্রম নয়। গত ১৫-২০ বছরের আবহাওয়ার তথ্য বলছে, হিমালয়ে ঋতুচক্রের চরিত্রই বদলে যাচ্ছে। শীত ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, আর গ্রীষ্ম দীর্ঘ হচ্ছে। আগে যেখানে সেপ্টেম্বর থেকেই তুষারপাত শুরু হত, এখন তা পিছিয়ে গিয়ে পৌঁছচ্ছে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে। কখনও আবার ফেব্রুয়ারি-মার্চ, এমনকি এপ্রিলেও ভারী তুষারপাত হচ্ছে— যা আগে ছিল অকল্পনীয়।
পশ্চিমী ঝঞ্ঝাও দুর্বল
এই অস্বাভাবিক শুষ্কতার পিছনে অন্যতম কারণ পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দুর্বল হয়ে পড়া। মৌসম ভবনের মহাপরিচালক মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাবট্রপিকাল ওয়েস্টারলি জেট স্ট্রিমের চরিত্র বদলাচ্ছে। তার জেরে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা উত্তর দিকে সরে যাচ্ছে এবং আরব সাগর থেকে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলত ঝঞ্ঝাগুলি দুর্বল হচ্ছে, বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত কমছে, বাড়ছে কুয়াশা ও দূষণ।
১৬ হাজারের বেশি হিমবাহ তুষারপাতের উপর নির্ভরশীল
হিমালয়কে অনেকেই ‘তৃতীয় মেরু’ বলেন, কারণ এখানে বিপুল পরিমাণ বরফ ও হিমবাহ সঞ্চিত রয়েছে। ওয়াডিয়া ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন গ্লেসিওলজিস্ট ডি পি দোভাল সতর্ক করে বলছেন, এই বরফভাণ্ডার মারাত্মক বিপদের মুখে। গোটা হিমালয় জুড়ে ১৬ হাজারের বেশি হিমবাহ রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ ভাবে তুষারপাতের উপর নির্ভরশীল।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তুষারপাত কমছে
দোভালের গবেষণায় উঠে এসেছে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তুষারপাত কমছে, তুষাররেখা সরে যাচ্ছে আরও উঁচুতে। আগে যেখানে অক্টোবরে হিমবাহ গলা থামত, এখন তা চলেছে তারও পরে। বাড়তি তাপমাত্রার জেরে হিমবাহে ফাটল ধরছে, ধস ও তুষারধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
‘দেবভূমি’র পাহাড় আজ তুষারহীন, শুষ্ক
বিশেষ করে বিপদের মুখে ছোট হিমবাহগুলি। এক বর্গকিলোমিটারের কম আয়তনের এই হিমবাহগুলি মোট বরফভাণ্ডারের ৬০-৭০ শতাংশ। দ্রুত হারিয়ে যেতে বসা এই বরফই পাহাড়ি অঞ্চলের জলজীবনের অন্যতম ভরসা।
সব মিলিয়ে উত্তরাখণ্ডের বর্তমান শুষ্ক শীত আসলে একটি বৈশ্বিক সংকটেরই প্রতিফলন। কারাকোরাম বা জম্মু-কাশ্মীরের কিছু অংশে তুষারপাত হলেও দুর্বল পশ্চিমী ঝঞ্ঝা উত্তরাখণ্ডে পৌঁছতে পারেনি। ফলে ‘দেবভূমি’র পাহাড় আজ তুষারহীন, শুষ্ক— আর গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।