মুম্বইয়ে চার বছর ধরে নথি জাল করে ট্রেডিংয়ের নামে এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতারণা করা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। কীভাবে চলছিল এই জালচক্র?

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
শেষ আপডেট: 27 November 2025 18:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বইয়ে ভয়াবহ আর্থিক প্রতারণার শিকার এক ৭২ বছরের ব্যবসায়ী। মাতুঙ্গা ওয়েস্টের বাসিন্দা ভরত হারকচাঁদ শাহ জানিয়েছেন, গত চার বছরে তাঁর স্ত্রী-র নামে খোলা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অনুমোদনহীন ট্রেডিং (Unauthorised Trading) চালিয়েছে গ্লোব ক্যাপিটাল মার্কেট লিমিটেড (Globe Capital Market Limited)। এই জালিয়াতির জেরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
কীভাবে শুরু হল প্রতারণা?
শাহ দম্পতি প্যারোলে ক্যানসার রোগীদের জন্য কম ভাড়ার গেস্ট হাউস চালান। ১৯৮৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর পাওয়া শেয়ার পোর্টফোলিও (Share Portfolio) তাঁরা কখনও ছুঁয়ে দেখেননি, কারণ শেয়ারবাজারের বিষয়ে তাঁদের কোনও ধারণা ছিল না। ২০২০ সালে এক বন্ধুর পরামর্শে শাহ নিজের এবং স্ত্রীর নামে ডিম্যাট (Demat) ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলে গ্লোব ক্যাপিটালের হাতে সেই পুরনো শেয়ারগুলি তুলে দেন। এরপরই শুরু হয় প্রতারণা।
কোম্পানির তরফে তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়, কোনও অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হবে না, শেয়ারকে জামানত (Collateral) হিসেবে রেখেই সহজে ট্রেড করা যাবে। আরও বলা হয়, ‘পার্সোনাল গাইড’ (Personal Guide) দেওয়া হবে। এই অজুহাতে অক্ষয় বারিয়া এবং করণ সিরোয়া নামে দুই কর্মী তাঁর পোর্টফোলিও “ম্যানেজ” করতে শুরু করেন। তারপরই মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওই দুই কর্মীর হাতে।
শুরুতে ফোনে ট্রেডিংয়ের নির্দেশ দিতেন তাঁরা। পরে বাড়িতে গিয়ে নিজেদের ল্যাপটপ থেকে মেল পাঠানো, ওটিপি (OTP) দেওয়া, এসএমএস খুলে দেখানো, সবই করিয়ে নিতেন। শাহ জানান, ধীরে ধীরে তাঁকে এমন ভাবে ‘ম্যানিপুলেট’ (Manipulate) করা হয় যে অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সমস্ত অ্যাকসেস কোম্পানির হাতে চলে যায়।
চার বছর ধরে ভুয়ো ‘প্রফিট’ স্টেটমেন্ট!
২০২০ থেকে ২০২, চার বছর ধরে যে বার্ষিক স্টেটমেন্ট আসত, সবেতেই দেখানো হত "প্রফিট" (Profit)। কোনও সন্দেহই হয়নি শাহর। কিন্তু জুলাই ২০২৪-এ হঠাৎ গ্লোব ক্যাপিটালের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে ফোন আসে, “আপনার ও আপনার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ৩৫ কোটি টাকার ডেবিট (Debit) দাড়িয়ে আছে। এখনই টাকা দিতে হবে, নইলে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হবে।”
অফিসে গিয়ে শাহ জানতে পারেন, তাঁর অজান্তে বিশাল অঙ্কের অননুমোদিত ট্রেডিং হয়েছে। শেয়ারের বড় অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ‘সার্কুলার ট্রেডিং’ (Circular Trading) করে অ্যাকাউন্টকে গভীর ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে সংস্থা।
সম্পত্তি হারানোর ভয়ে বাকি শেয়ার বিক্রি করে দেন তিনি এবং পুরো ৩৫ কোটি টাকার দেনাও শোধ করেন।
কীভাবে ফাঁস হল জালিয়াতি?
গ্লোব ক্যাপিটালের ওয়েবসাইট থেকে মূল ট্রেডিং স্টেটমেন্ট ডাউনলোড করে যখন তিনি ই-মেলে পাওয়া ‘প্রফিট’-এর স্টেটমেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তখনই ধরা পড়ে বিশাল ফারাক। আরও জানা যায়, এনএসই (NSE) থেকে একাধিক নোটিস এসেছিল। কিন্তু সেগুলির জবাব গ্লোব ক্যাপিটাল শাহর নামে পাঠালেও, ওই নোটিস তাঁর কাছে পৌঁছনো হয়নি।
শাহর কথায়, 'চার বছর ধরে আমাদের সামনে এক ছবি দেখানো হয়েছে। আসল ক্ষতি আড়াল করে গিয়েছে কোম্পানি।'
এরপর তিনি ভানরাই থানায় এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪০৯ (Criminal Breach of Trust), ৪২০ (Cheating) সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। ফাইলটি এখন তদন্তের জন্য মুম্বই পুলিশের ইকনমিক অফেন্সেস উইংয়ের (EOW) হাতে।
শাহ এটিকে 'সাংগঠনিক আর্থিক প্রতারণা' (Organised Financial Fraud) বলছেন। তদন্তে এখন ফোকাস, চার বছর ধরে কী ভাবে এত বড় জালিয়াতি ঘটল, এবং কারা এর পিছনে জড়িত।