শহরের মোট অবৈধ অভিবাসীর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও, গবেষকরা মুম্বইয়ের ৬১টি এলাকা চিহ্নিত করে ৭ হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেন। তাঁদের মধ্যে ৩,০১৪ জনকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
.jpeg.webp)
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 12 January 2026 21:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসম, ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গ - দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ (Illegal Immigrants) নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। প্রায়ই এই ইস্যুতে উত্তপ্ত হয় জাতীয় রাজনীতি। গত বছর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) ‘অনুপ্রবেশমুক্ত ভারত’-এর ডাক দিয়েছিলেন। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে (Bihar Elections 2025) বিজেপিও সেই বক্তব্যকে সামনে রেখে প্রচার চালায়। সামনে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে নির্বাচন, সেখানে এই প্রসঙ্গ আরও একবার সামনে আসছে।
কিন্তু দেশের একেবারে অন্য প্রান্তে, ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বইয়ে (Mumbai) যে এক ভিন্ন ছবি ধরা পড়ছে, তা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশেষ রিপোর্ট এবং মুম্বই স্কুল অফ ইকনমিক্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি (MSEPP) ও টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, মুম্বই এখন বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে আসা অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের (Illegal Immigrants from Bangladesh and Myanmar) একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক মেধা তাপিওয়ালা এবং সৌভিক মণ্ডল - বর্তমানে নয়ডার গ্যালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও প্রাক্তন টিস গবেষক। শহরের মোট অবৈধ অভিবাসীর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও, গবেষকরা মুম্বইয়ের ৬১টি এলাকা চিহ্নিত করে ৭ হাজারের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেন। তাঁদের মধ্যে ৩,০১৪ জনকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অবৈধ অভিবাসীদের ৯৬ শতাংশই বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে আসা মুসলিম।
২০২৪ সালের নভেম্বরে টিস-এর অন্তর্বর্তী রিপোর্ট (TISS Report) প্রকাশিত হয়। তারই সম্প্রসারিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ হিসেবে মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর। এই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, অধিকাংশ অনুপ্রবেশকারী বৈধ ভিসা ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করেছেন এবং পরে আধার, ভোটার কার্ড ও প্যান কার্ডের মতো ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন।
সৌভিক মণ্ডলের দাবি, “বাংলাদেশের একজন দরিদ্র মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসে, ভুয়ো নথি জোগাড় করে ভোটার হয়ে ওঠে এবং পরে পুরসভা থেকে লোকসভা - সব নির্বাচনে ভোট দেয়। একটি ‘ধূসর ধর্মীয় নেটওয়ার্ক’-এর সহায়তায় এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।”
রিপোর্টে উঠে এসেছে তথাকথিত ‘মালভানি প্যাটার্ন’-এর (Malvani Pattern) কথা। প্রথমে জলাভূমি বা ম্যানগ্রোভ এলাকায় অবৈধ বসতি গড়ে ওঠে। তার পর ঝুপড়ি, ধর্মীয় কাঠামো, স্থানীয় প্রভাবশালীদের রক্ষা এবং ধাপে ধাপে ভুয়ো নথিপত্র - এই প্রক্রিয়ায় স্থায়ীভাবে বদলে যায় ভোটার তালিকা। সমীক্ষা বলছে, ইতিমধ্যেই ৭৩ শতাংশের কাছে ভোটার আইডি রয়েছে। এর ফলে মুম্বইয়ের অন্তত ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্র, একটি লোকসভা কেন্দ্র এবং ৫৬টি পুরসভা ওয়ার্ডে এর প্রভাব পড়ছে।
অর্থের উৎস নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কিছু অবৈধ বসতিতে আধুনিক সুযোগসুবিধা, দামি রং ও টাইলস দেওয়া ঘরের খোঁজ মিলেছে, এমনকি নৌবাহিনীর ঘাঁটির পাশেও। গবেষকদের দাবি, শুক্রবারের নামাজের পর সংগৃহীত অর্থ নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে, সেখান থেকে অন্যত্র পাঠানো হয়। আর বিভিন্ন নথি তৈরির ক্ষেত্রে ৭,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলেও দাবি।
জনসংখ্যার ছবিটাও বদলে যাচ্ছে বলে দাবি রিপোর্টের। ১৯৫১ সালে মুম্বইয়ের জনসংখ্যায় হিন্দুদের হার ছিল ৮৮ শতাংশ। ২০১১ সালে তা নেমে আসে ৬৬ শতাংশে। একই সময়ে মুসলিম জনসংখ্যা ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে। এই ধারা চললে ২০৫১ সালের মধ্যে শহরে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যেতে পারেন - এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে সতর্কবার্তা, এই পরিবর্তন শুধু সামাজিক উত্তেজনা নয়, দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।