অ্যাকাউন্টগুলির অনেকগুলিই সাধারণ মানুষের নামে, যাঁদের সহজে টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে যুক্ত করা হয়। তাঁদের বোঝানো হয়, ঝুঁকি খুবই কম এবং তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ‘পার্কিং অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বাস্তবে, সেই অ্যাকাউন্টগুলিই সাইবার প্রতারণার টাকার লেনদেনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 15 February 2026 15:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জম্মু-কাশ্মীরে (Jammu and Kashmir) এক বিশাল ‘ডিজিটাল হাওয়ালা’ চক্রের (digital hawala network India) হদিস পেল ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। তদন্তকারীদের মতে, এই চক্রের মূলে রয়েছে তথাকথিত ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ (mule accounts Jammu Kashmir)-এর জাল, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের টাকা ঘুরছে এবং সেই অর্থের একাংশ দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে (financial crime) ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা।
সর্বভারতীয় এক সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন বছরে এই অঞ্চলে ৮ হাজারেরও বেশি এমন অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করে 'ফ্রিজ' করা হয়েছে (mule accounts freeze Jammu Kashmir)। এতে সামনে এসেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ 'সাদা' করার একটি জটিল এবং সুসংগঠিত চক্র।
তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, সাইবার অপরাধের পুরো চক্রে ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ সবচেয়ে দুর্বল হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অ্যাকাউন্টগুলি না থাকলে প্রতারকরা চুরি করা টাকা সহজে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো অচিহ্নিত 'ডিজিটাল সম্পদে' রূপান্তর করতে পারত না।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ এবং অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই ধরনের অ্যাকাউন্টের বৃদ্ধি রুখতে নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি, ‘মিউলার’ নামে পরিচিত মধ্যস্থতাকারীদের খুঁজে বের করার কাজও চলছে, যারা এই আর্থিক প্রতারণার নানা ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ২০১৭ সালে এনআইএ বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (National Investigation Agency) যখন এই অঞ্চলে বেআইনি অর্থের কারবারের বিরুদ্ধে কড়া অভিযান শুরু করে, তখন থেকেই দেশবিরোধী নেটওয়ার্কগুলি তাদের কৌশল বদলাতে শুরু করে। প্রচলিত হাওয়ালার বদলে তারা এখন ‘ডিজিটাল হাওয়ালা’ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছে।
এই নতুন ব্যবস্থায় মিউল অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীদের এবং মিউলারদের পাওয়া কমিশনের টাকা দেশবিরোধী কার্যকলাপে ব্যবহার হতে পারে বলেই সন্দেহ তদন্তকারীদের।
একজন ‘মিউলার’ সাধারণত প্রতারণার শিকারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে না বা ভুয়ো লিঙ্ক ছড়ায় না। কিন্তু তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিয়মিত নতুন মিউল অ্যাকাউন্ট জোগাড় করে এবং তা পরিচালনা করে, যাতে প্রতারকরা সহজে চুরি করা টাকা গ্রহণ ও স্থানান্তর করতে পারে এবং নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রেখেই বহু অ্যাকাউন্টে দ্রুত টাকা ঘোরানো সম্ভব হয়।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, এই অ্যাকাউন্টগুলির অনেকগুলিই সাধারণ মানুষের নামে, যাঁদের সহজে টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে যুক্ত করা হয়। তাঁদের বোঝানো হয়, ঝুঁকি খুবই কম এবং তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ‘পার্কিং অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বাস্তবে, সেই অ্যাকাউন্টগুলিই সাইবার প্রতারণার টাকার লেনদেনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তদন্তে জানা গিয়েছে, এক একজন প্রতারক একই সঙ্গে ১০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত মিউল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুয়ো সংস্থার নামে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, যাতে বড় অঙ্কের টাকা, কখনও দিনে ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত, লেনদেন হলেও সহজে সন্দেহ না হয়।
টাকা লেনদেনের পদ্ধতিটিও অত্যন্ত জটিল। দ্রুত একাধিক অ্যাকাউন্টে টাকা ঘোরানো হয় এবং তা ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়, যাতে নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া যায়।
নিরাপত্তা আধিকারিকরা স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন, মিউল অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীরা সরাসরি প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাঁরা মানি লন্ডারিংয়ের অংশীদার। কারণ, নিজের ব্যাঙ্ক তথ্য অন্যের হাতে তুলে দিয়ে এবং কমিশন নেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা এই অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছেন।
একজন শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, “পুরো প্রতারণা ব্যবস্থাই এই অ্যাকাউন্টগুলির উপর নির্ভর করে। টাকা গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতারণা প্রথম ধাপেই ব্যর্থ হয়ে যেত। যারা নিজেদের অ্যাকাউন্ট ভাড়া দিচ্ছেন, তারা শুধুই পরিস্থিতির শিকার নন - এই অপরাধের চালিকাশক্তি।”
কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির একটি সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে, চিন (China), মালয়েশিয়া (Malaysia), মায়ানমার (Myanmar) এবং কম্বোডিয়া (Cambodia)-র মতো দেশের কিছু ব্যক্তি নাকি জম্মু-কাশ্মীরের লোকজনকে ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো ওয়ালেট খুলতে প্ররোচিত করছে। এই ওয়ালেটগুলি সাধারণত ভিপিএন ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যাতে ডিজিটাল পরিচয় গোপন থাকে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘কেওয়াইসি’ যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ভ্যালিতে ভিপিএনের অপব্যবহার রুখতে আগেই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। কারণ, নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মতে, সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি নজর এড়াতে ভিপিএন ব্যবহার করে থাকে।