শেষ পর্যন্ত নীতীশ কুমারও ছেলেকে রাজনীতিতে আনলেন! এতদিন পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করা মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে কি ভোঁতা হয়ে যাবে মোদীর ‘পরিবারবাদ’ অস্ত্র? শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 7 March 2026 11:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের পুত্র নিশান্ত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জনতা দল ইউনাইটেডের সদস্যপদ গ্রহণ করবেন। শুক্রবার পাটনায় নীতীশের উপস্থিতিতে জেডিইউ-র শীর্ষ নেতৃত্ব এক বৈঠকে নিশান্তকে দলীয় সদস্য পদ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে সরকারেও নীতীশের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।
মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার বর্তমানে বিহার বিধান পরিষদের সদস্য। তিনি রাজ্যসভায় চলে গেলে বিধান পরিষদে তাঁর শূন্য আসনে প্রার্থী হবেন নিশান্ত। জেডিইউ সূত্রের খবর, দলের প্রবীণ নেতারা নিশান্তকে পার্টিতে নেওয়ার বিষয়ে নীতীশের মত শুনতে চাইলে তিনি শুধু মুচকি হেসেছেন। এরপর দলের সভাপতি নীতীশ কুমারের উপস্থিতিতেই নিশান্তকে জেডিইউতে নেওয়ার প্রস্তাব পাশ করা হয়।
নীতীশ প্রায় টানা দু দশক বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকলেও পুত্র নিশান্ত কোনওদিনই রাজনীতি নিয়ে উৎসাহ দেখারনি। নীতীশও এই ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। বরং লালু প্রসাদ যাদব তাঁর দুই পুত্র ও কন্যাদের রাজনীতিতে আনায় বারে বারে পরিবারবাদ নিয়ে একদা রাজনৈতিক সতীর্থকে আক্রমণ করেছেন নীতীশ।
সেই নীতীশ কুমার এখন ছেলেকে রাজনীতিতে এনে সরাসরি উপমন্ত্রী এবং দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শুধু আরজেডিসহ বিরোধী দলগুলি নয় জেডিইউ-র অন্দরেও চাপা ক্ষোভ আছে। নীতীশ নিজে বারে বারে দলে পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করেছেন। এই যুক্তিতে দলের বহু নেতার পুত্র-কন্যাকে নির্বাচনের টিকিট দেননি।
সেই নীতীশ কুমার এখন ছেলেকে রাজনীতিতে আনায় জেডিওকে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কেন এই উলটপুরাণ। দলের ব্যাখ্যা, ব্যক্তিগতভাবে নীতীশ কুমার ছেলেকে রাজনীতিতে আনতে চাননি। তাঁর পুত্রও এই ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি কখনও। তবে বিহারের রাজনীতির বাস্তবতা মেনে নিশান্তকে দলের মুখ করতে হচ্ছে। এক শীর্ষ নেতার কথায়, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর নীতীশ কুমার যে ইবিসি বা অতি পশ্চাদপদ সম্প্রদায়ের ভোট ব্যাঙ্ক গড়ে তুলেছেন তা অটুট রাখতে নিশান্তকে প্রয়োজন। কারণ ওই ভোট ব্যাঙ্কের সঙ্গে ব্যক্তি নীতীশ কুমারের প্রতি আস্থা, ভরসা জড়িত। তিনি রাজ্য রাজনীতি এবং মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে সরে গেলে অতি পিছড়া বর্গের ভোট ধরে রাখতে নীতীশের প্রতিনিধিত্ব করবেন নিশান্ত। মূলত এই বোঝাপড়া থেকেই নীতীশ পুত্রকে রাজনীতিতে এক প্রকার টেনে আনা হল।
তবে রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের মত হল নীতীশের এই সিদ্ধান্তে রীতিমতো বিপাকে পড়ল বিজেপি এবং দলের মুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজু জনতা দল, ভারত রাষ্ট্র সমিতি ও ডিএমকের মত আঞ্চলিক দলগুলিকে পরিবারবাদী বলে আক্রমণ করে আসছিলেন। সেইসঙ্গে প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে। মোদী একাধিক সরকারি ও দলীয় সভায় নীতীশ কুমারের নাম করে বলেছেন, 'বিহারে নীতীশবাবু গোটা দেশের কাছে আদর্শ। তিনি রাজনীতিতে পরিবারবাদ কায়েম করেননি।' মোদীর কথায়, ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বিপদ পরিবারবাদ।
বলাই বাহুল্য তিনি এই ব্যাপারে বারে বারেই কংগ্রেসের গান্ধী পরিবার এবং আঞ্চলিক দলগুলির শীর্ষ নেতাদের পরিবারের সদস্যদের দল ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো নিয়ে সরব হয়েছেন।
পরিবারবাদের ইস্যুতে মোদীর চোখে ভিন্ন চরিত্র নীতীশ কুমার সেই একই জুতোয় পা গলানোয় অনেকেই মনে করছেন, এর ফলে বিপাকে পড়ল বিজেপি। ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যও নীতীশের সিদ্ধান্ত হতাশাব্যঞ্জক, মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই। সামনেই পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুতে অতীতের মতোই পরিবারবাদকে বড় ইস্যু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল বিজেপি। তাদের সেই কৌশল কিছুটা হলেও ধাক্কা খাবে নীতীশের সিদ্ধান্তে।