কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত বিজেপি যেমন দলিত রাজনীতিতে গা ভাসিয়েছে সেই সঙ্গে প্রয়াত কাঁশি রামকেও জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দিতে শুরু করেছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 9 October 2025 11:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার বহুজন সমাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাঁশি রামের উনিশ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬ এর এই দিনে প্রয়াত হন আধুনিক ভারতে দলিত স্বার্থে আন্দোলনের উজ্জ্বল মুখ কাঁশি রাম।
বহুজন সমাজ পার্টির সুপ্রিম মায়াবতী বৃহস্পতিবার লখনউয়ের কাঁশি রাম মেমোরিয়াল ময়দানের দলীয় সভায় ভাষণ দেবেন। রাজ্যের তিনবারের এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বহুদিন ধরেই মাঠ-ময়দানে রাজনীতি থেকে দূরে আছেন শারীরিক কারণে। প্রায় এক যুগ পর তিনিও বৃহস্পতিবার লখনউয়ের অনুষ্ঠানে কাঁশি রাম বন্দনায় অংশ নেবেন। বিএসপি সুপ্রিমো ঘোষণা করেছেন বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠান যে কোনও নির্বাচনী সমাবেশের থেকেও বড় আকার নেবে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, কাঁশি রাম বন্দনায় শামিল হচ্ছে বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেসের মতো প্রথম সারির দলগুলিও। এসপি নেতা অখিলেশ রাজ্যের সমস্ত দলীয় কার্যালয়ে মৃত্যু দিনে দলিত নেতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। লখনউয়ে প্রদেশ কংগ্রেস অফিসে আয়োজিত হবে কাঁশি রাম স্মরণ সভা। অন্যদিকে বিজেপিও সমাজবাদী পার্টির মতোই গোটা রাজ্যে কাঁশি রাম বন্দনার আয়োজন করেছে। রাজ্যের বিভিন্ন দলের নেতারা সকাল থেকে এক্স পোস্টে প্রয়াত দলিত নেতাকে স্মরণ করেছেন। দলিত সমাজের উন্নয়নে তার অবদানকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
অন্য দলগুলির কাঁশি রাম স্মরণ অনুষ্ঠানকে মোটেই ভালোভাবে দেখছেন না বিএসপি নেত্রী মায়াবতী। তিনি মনে করছেন ভোটের স্বার্থে মনুবাদী দলগুলি বিএসপির প্রতিষ্ঠাতার দলিত রাজনীতিতে গা ভাসাতে চাইছে। মায়াবতী এই ব্যাপারে বিএসপির নেতা কর্মী সমর্থকদের সতর্ক করে দিয়েছেন।
কাঁশি রামকে স্মরণে উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান হল কাঁশি রাম স্মৃতি প্রাঙ্গন মেরামতির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা। দিন ১৫ আগে মায়াবতী ঘোষণা করেছিলেন তিনি এবার তাঁর দলের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যু দিনটি ওই মেমোরিয়াল প্রাঙ্গনে পালন করতে চান। যোগী সরকার দীর্ঘদিন সেটি বন্ধ রেখেছিল সংস্কারের কাজ চলায়। দেখা যায় মায়াবতী তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর তিনি উত্তর প্রদেশ সরকারের অফিসারেরা মেমোরিয়াল প্রাঙ্গণে গিয়ে সংস্কারের কাজ তদারকি করেন। রাজনৈতিক মহল মনে করছে এই ভাবেই দলিত নেতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ওই সম্প্রদায়কে আরও কাছে টানতে চাইছে বিজেপি। যদিও জীবদ্দশায় কাঁশি রামকে রীতিমত প্রতিপক্ষ মনে করত গেরুয়া শিবির। তাঁর দলিত রাজনীতিকে ভারত ভাঙ্গার চক্রান্ত বলেও বারে বারে অভিযোগ করেছে বিজেপি।
কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত বিজেপি যেমন দলিত রাজনীতিতে গা ভাসিয়েছে সেই সঙ্গে প্রয়াত কাঁশি রামকেও জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দিতে শুরু করেছে।
তাঁর জন্মশর্তবর্ষের এখনও আট বছর বাকি। তবু প্রয়াত এই দলিত নেতাই উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির অঙ্গনে ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। রাজ্যবাসীকে অবাক করে গিয়ে শাসক দল বিজেপি গত ১৫ মার্চ ধূমধাম করে পালন করেছে। তাঁর কাঁশি রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শত শত টুইট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ-সহ রাজ্য ও জেলাস্তরের বিজেপি নেতারা। কাঁশি রামের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বিনা আমন্ত্রণে হাজির হয়ে তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিজেপির অনেক নেতা। বস্তুত, কাঁশি রামের দল বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং দলনেত্রী মায়াবতীর সেদিনের কর্মসূচি খানিক আড়ালে চলে গিয়েছিল গেরুয়া শিবিরের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আয়োজনে।
প্রয়াত এই নেতার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরতে আসরে নেমেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টিও। দু বছর আগে রায়বেরলিতে কাঁশি রামের মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন সপা সুপ্রিমো তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ। মূর্তিটি সমাজবাদী পার্টিই তৈরি করায়।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, মায়াবতী রাজনীতিতে নিজেকে গুটিয়ে নয় বহুজন সমাজ পার্টির দখলে থাকা দলিত ভোট আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে সব দলই ওই ভোটে থাবা বসাতে সক্রিয়। বিগত নির্বাচনগুলিতে তারা এই ব্যাপারে অনেকটাই সফল হয়েছে। সবচেয়ে সফল অবশ্যই পদ্ম শিবির। উত্তর প্রদেশ বিধানসভায় মায়াবতী দলের এখন মাত্র একজন বিধায়ক এবং দলের ভোট ছয় শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছে।
বিএসপি নেত্রী মায়াবতী বেশিরভাগ দিন বাড়ি থেকে বের হন না। তিনি কতটা অসুস্থ আর কতটা সিবিআইয়ের হাত থেকে বাঁচতে বিজেপির সঙ্গে বোধাপড়া করে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রধান দুই দল বিজেপি এবং সপা।
বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবের আরজেডি’র মতোই উত্তরপ্রদেশে মুলাময় সিং যাদব প্রতিষ্ঠিত সমাজবাদী পার্টির ভরসা বলতে মুসলিম ও যাদব ভোট, যা সংক্ষেপে ‘এমওয়াই’ সমীকরণ নামে পরিচিত। মুলায়ম সিং যাদব অসুস্থ হয়ে গৃহবন্দি হয়ে যেতেই বিজেপি তাঁর যাদব ভোটে থাবা বসানোর নানা কৌশল অবলম্বন করেছিল। অন্যদিকে, বহুজন সমাজবাদী পার্টি অর্থাৎ মায়াবতীর দলিত ভোটেও থাবা বসায় গেরুয়া শিবির।
মুসলিম ভোট নিয়ে নিশ্চিন্ত অখিলেশের চিন্তা স্বজাতি যাদবদের নিয়েই বেশি। গত বিধানসভা ভোটের ফল বলছে যাদব ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরিয়েই যোগী আদিত্যনাথের সরকার টিকে গিয়েছে উত্তরপ্রদেশে। অখিলেশও তাই যাদব ভোটের ঘাটতি পূরণে বহুজন সমাজবাদী পার্টির দলিত ভোটকে কাছে টানতে চাইছেন। তাই বিএসপির প্রতিষ্ঠাতা জন্ম ও মৃত্যুদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন মুলায়ম পুত্রও।
মুলায়ম ও কাশীরামের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও বিজেপিকে মোকিবিলায় একটা সময় উত্তরপ্রদেশে তাঁদের বোঝাপড়া রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল। লোহিয়াবাদী বলে খ্যাত মুলায়ম আম্বেদকরবাদী কাঁশি রামের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ১৯৯৩-এ সরকার গড়েন উত্তরপ্রদেশে। সেই বোঝাপড়ার জেরেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কয়েক মাস পরের ভোটে প্রবল রাম ঝড়েও বিজেপি লখনউয়ের কুর্সি পুনর্দখল করতে পারেনি।
সপা ও বিএসপির দ্বিতীয়বার বোঝাপড়া হয়েছিল ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে। যদিও ভোটের ফল প্রকাশের পর পরই দুই দল একে-অপরের দিকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলে। গত বছর বিধানসভা ভোটে অখিলেশ ও মায়াবতীর দলের লড়াই দেখে মনেই হয়নি রাজ্যে ক্ষমতায় বিজেপি। তাতে বড় ক্ষতি হয় মায়াবতীরই। তিনবারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পার্টি, সর্বভারতীয় দলের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিএসপির বস্তুত গর্ভগৃহেই নিশ্চিহ্ন হওয়ার জোগার হয়েছে। একটি মাত্র বিধানসভা আসনে জয় হাসিল করতে সক্ষম হয় বহেনজির পার্টি।
বিএসপি-র এই দুর্বলতারই সুযোগ নিতে চাইছে বিজেপি এবং অখিলেশের দল সপা। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয় কাঁশি রামের ভোট ব্যাঙ্ক মায়াবতীর হাত থেকে পুরোপুরি ছিনিয়ে নিতে আদৌ সক্ষম হবে কি বিজেপি, সপা, হলে কোন দল বেশি লাভবান হবে।
এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত মায়াবতী বছরখানেক হল কিছুটা হলেও সক্রিয় হয়েছেন। তিনি বিএসপিতে বড় ধরনের পরিবর্তন করেছেন। দলের সেকেন্ড নিন কমান্ড করেছেন তার ভাইপো আকাশকে। জেলা নেতৃত্বেও আমূল পরিবর্তন করেছেন। তা নিয়ে আবার দলের মধ্যে খুব বিক্ষোভের শেষ নেই।
দলের একাংশের অভিযোগ একটা সময় মায়াবতী তাঁর রাজনৈতিক গুরু কাঁশি রামকে ভুলেই গিয়েছিলেন। নিজেকেই দলিত সমাজের মুখ বলে তুলে ধরে দলের বিপদ ডেকে এনেছেন। ওই অংশের বক্তব্য স্বাধীনতার পর দেশে দলিত সমাজকে সংঘটিত করে ছিলেন কাঁশি রাম। তিনি মায়াবতীকে দলে নিয়ে এসে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু দলিত নেত্রী তার রাজনৈতিক গুরুকেই একটা সময় আড়ালে ঠেলে দেন। তারিখ খেসারত দিতে হচ্ছে আজ। তাই অন্য দলগুলি কাঁশি রাম বন্দনাম মাতলে মায়াবতী অসন্তোষ গোপন করছেন না। ভয় পাচ্ছেন দলিতের সমর্থন আরও হারানোর।