গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে বহু পরিবার এখন বিকল্প রান্নার ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে। অনেকে ইনডাকশন কুকটপ, বৈদ্যুতিক হিটার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক রান্নার যন্ত্র ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বাড়ছে।

ছবি (AI)
শেষ আপডেট: 13 March 2026 14:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রান্নার গ্যাস নিয়ে প্যানিক ও উৎকন্ঠা এখন গোটা দেশ জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের তা একটি সমীক্ষায় স্পষ্ট ধরা পড়েছে। ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের অর্ধেকেরও বেশি পরিবার জানিয়েছে, তারা নিয়মিত সময়ে এলপিজি (LPG shortage) সিলিন্ডার পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বুকিং করার পরও ডেলিভারি পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কয়েক দিন, কোথাও আবার সপ্তাহখানেকও লেগে যাচ্ছে। কোথাও বুকিং (LPG crisis latest news) নিচ্ছেই না। গ্যাসের দোকানেও বুকিং (gas booking) নিচ্ছে না, ফোনেও না, হোয়াটসঅ্যাপেও না। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে কিছু পরিবার বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনছে, বলেও জানিয়েছে সমীক্ষায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ।
কী বলছে সমীক্ষা?
লোকাল সার্কেলস (Local Circles) নামে এক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যারা সম্প্রতি সমীক্ষাটি চালায়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১৯ হাজার মানুষ অংশ নেন। সমীক্ষার ফলাফল বলছে—প্রায় ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন LPG সরবরাহ নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ৪৩ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বুকিং ও ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে। যাঁরা সমস্যার কথা বলেছেন, তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন যে বুকিং করার পর ডেলিভারি পেতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।
সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ। অনেক জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়ে ও সরবরাহকারীরা প্রতি সিলিন্ডারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে কিছু গ্যাস এজেন্সি ও দালালরা একটি সিলিন্ডারের জন্য ১৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে বলে অভিযোগ।
বর্তমানে দেশে একটি গৃহস্থালি LPG সিলিন্ডারের দাম সাধারণত ৯০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে, আর বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকার মধ্যে থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের প্রায় দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। গ্যাসের অনিশ্চিত সরবরাহের কারণে বহু পরিবার এখন বিকল্প রান্নার ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করেছে। অনেকে ইনডাকশন কুকটপ, বৈদ্যুতিক হিটার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক রান্নার যন্ত্র ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে রেস্তোরাঁ মালিকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, যদি গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে—রান্নার খরচ বেড়ে যাবে। অনেক রেস্তোরাঁকে মেনু সীমিত করতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধও রাখতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সরবরাহ সংকটের পেছনে বড় কারণ হল মধ্যপ্রাচ্যে চলা সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের ফলে স্ট্রেট অব হরমুজ এলাকায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এই সমুদ্রপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ—ভারতের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ LPG আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতারসহ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে গ্যাস আসে। এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহণে সমস্যা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়েছে।
খবর অনুযায়ী, দেশের বেশ কয়েকটি বড় শহরেও ইতিমধ্যেই গ্যাস সরবরাহে দেরির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি ও এনসিআর। অনেক জায়গায় গ্যাস এজেন্সির সামনে গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে বলেও জানা গেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে—গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য LPG সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। অত্যবশ্যক পণ্য আইন প্রয়োগ করে মজুতদারি ও কালোবাজারি রুখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিলিন্ডার বুকিংয়ের ব্যবধান ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে, যাতে কেউ অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত করতে না পারে। তা ছাড়া রিফাইনারিগুলিকে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া রাজ্য সরকারগুলিকেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে বলা হয়েছে যাতে কোথাও আইনশৃঙ্খলা সমস্যা বা অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ঘটনা না ঘটে। কিছু এলাকায় ইতিমধ্যেই প্রশাসন সক্রিয় হয়েছে। দিল্লি পুলিশ গ্যাস এজেন্সিগুলির তালিকা তৈরি করে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে, যাতে গ্যাস সরবরাহে কোনও ধরনের কালোবাজারি বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ শৃঙ্খলে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব আরও বাড়তে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে রান্নার গ্যাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন প্রয়োজন। তাই সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও দ্রুত বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।