একদিন সদ্য ডাক্তার ছেলে রায়রুকে ডাকলেন কাছে। বললেন, যদি জীবনে টাকা কামানোই লক্ষ্য হয়, তাহলে অন্য কোনও চাকরি বেছে নাও। বাবার সেই একটা ইঙ্গিতই যুবক ডাক্তারের মনে গেঁথে গিয়েছিল।
.jpeg.webp)
এ কে রায়রু গোপাল।
শেষ আপডেট: 5 August 2025 15:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রায় ৬ দশক আগের কথা। উত্তর কেরলের কান্নুর জেলার বাসিন্দা ডাঃ এ গোপালন নাম্বিয়ারের ঘরেও দ্বিতীয় প্রজন্মের ডাক্তার হলেন তাঁর ছেলে। নাম্বিয়ারের সেই আমলে বেশ নামডাক ছিল। তিনি একদিন সদ্য ডাক্তার ছেলে রায়রুকে ডাকলেন কাছে। বললেন, যদি জীবনে টাকা কামানোই লক্ষ্য হয়, তাহলে অন্য কোনও চাকরি বেছে নাও। বাবার সেই একটা ইঙ্গিতই যুবক ডাক্তারের মনে গেঁথে গিয়েছিল। তারপর থেকেই তরুণ ডাক্তার এ কে রায়রু গোপাল ডাক্তারিকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন মাত্র ২ টাকা ভিজিট দিয়ে।
এই ২ টাকাতেই রায়রু গোপাল প্রায় অর্ধশতক ধরে ডাক্তারি করে গিয়েছেন। যে কারণে লোকে তাঁকে ‘২ টাকার ডাক্তার’ বলে উপাধি দিয়েছিল। সেই রায়রুর নিজের জীবনের সলতে নিঃশেষ হয়ে গেল ৮০ বছর বয়সে। গ্রামের গরিবগুর্বো, খেতে না পাওয়া, চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের কাছে ভগবানের মর্যাদা পেয়ে আসা ২ টাকার ডাক্তারের মৃত্যুতে গোটা জেলা শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
কেরলের কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে রায়রুকে জনগণের ডাক্তার বলে বর্ণনা করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সর্বহারা মানুষের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে যে কাজ করে গিয়েছেন সেকথা উপকৃতরা চিরকাল মনে রাখবে।
ডাঃ রায়রু এমবিবিএস পাশ করেন কোঝিকোড় মেডিক্যাল কলেজ থেকে। কান্নুরে একটি সরকারি হাসপাতালে কাজ শুরু করলেও তালাপ নামে একটি জায়গায় নিজের চেম্বার খোলেন। সেখানে তিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে চিকিৎসা করে গিয়েছেন। পরে তিনি মণিক্কাকাভু মন্দিরের কাছে একটি বাড়িতে চলে যান। সেখানে চিকিৎসা শুরু করেন। স্থানীয়রা জানান, তাঁর চেম্বার এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে, বাসস্টপের নামই হয়ে গিয়েছিল তাঁর নামে এবং সেখানে সব রুটের বাস দাঁড়াত।
ডাঃ রায়রুর চেম্বারের সময় ছিল ভোর ৪টে থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত। কারণ, তিনি জানতেন কলকারখানা ও জমিতে খেটে খাওয়া মানুষের সময়ের দাম কত। রোগী দেখা শুরু হয়ে যেত শেষরাত ৩টে থেকেই। কোনও কোনও দিন প্রায় ৩০০ রোগী দেখতে হতো তাঁকে। এছাড়া গড়ে রোজ ২০০ রোগী দেখতেন। তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী, শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় ১৮ লক্ষ রোগী দেখেছেন ডাক্তারি জীবনে।
স্থানীয়রা জানান, কম দামের ওষুধ লিখতেন ডাক্তারবাবু। ২ টাকাও ভিজিট মকুব করতেন অনেক সময়। ওষুধের পয়সা না থাকলে নিজেই দিয়ে দিতেন। এত কম পয়সা বলে কান্নুর জেলার বাইরে থেকেও লোকে দেখাতে আসত। শেষের দিকে ২ টাকার জায়গায় ১০ টাকা ফিজ নিতেন।
রায়রু ঘুম থেকে উঠতেন রাত সওয়া ২টোর সময়। উঠেই গোরুদের খাওয়ানো, গোয়াল পরিষ্কার করা এবং দুধ দুইতেন। পুজো শেষ করেই শুরু করতেন রোগী দেখতে। রায়রুর স্ত্রী ডাক্তার শকুন্তলা রোগী সামলাতেন, ওষুধ বিলি করতেন। রায়রুর অপর দুই ভাই বেণুগোপাল ও রাজাগোপালও মুনাফাহীন ডাক্তারি করতেন বাবারই নির্দেশে। পেশা হিসেবে তাঁর চিকিৎসায় অসংখ্য পরিবারে জীবনপ্রদীপ জ্বেলে দিয়ে নিজের সলতে নিঃশেষ হয়ে গেল ৮০-তে এসে।