যুগ যুগ ধরে এদেশে, এমনকী বিদেশে থাকা ভারতীয়রাও এইদিনটিকে উৎসবের মতো পালন করেন। এদেশের প্রায় সব বর্ণের হিন্দুরা রাখি উৎসব পালন করলেও এখন সব ধর্মের মানুষও এই অটুট সম্পর্কের রীতিকে আত্মস্থ করে নিয়েছেন।

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 5 August 2025 11:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাখিবন্ধন। ভাইবোনের এক অমলিন, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বাঁধন। যুগ যুগ ধরে এদেশে, এমনকী বিদেশে থাকা ভারতীয়রাও এইদিনটিকে উৎসবের মতো পালন করেন। এদেশের প্রায় সব বর্ণের হিন্দুরা রাখি উৎসব পালন করলেও এখন সব ধর্মের মানুষও এই অটুট সম্পর্কের রীতিকে আত্মস্থ করে নিয়েছেন। সেই হিসেবে রাখিবন্ধন এখন ভারতের অন্য বেশ কিছু উৎসবের মতোই জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
রাখির দিন দিদি হোক বা বোন ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় তার হাতে বন্ধনের গিঁট দিয়ে দেয়। রাখি পরানোর একটি আদি-অনন্তকালের পদ্ধতি হচ্ছে- রাখির সুতোর তিনটি গিঁট দিতে হয় বোনকে। কেন এই তিনটি গিঁট? কী রয়েছে এই তিনটি গিঁটের নেপথ্যে, তা অনেকেই জানেন না। বড়দের কাছ থেকে শিখে এই তিনটি গিঁটের প্রথাই চলে এসেছে প্রাচীন কাল থেকে। জেনে নেওয়া যাক, রাখিবন্ধন সম্পর্কে আরও বেশ কিছু কথা।
বাঙালির কাছে রাখিবন্ধনের রাজনৈতিক প্রচার বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের ১৬ অগস্ট, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন রাস্তায় নামলেন লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। লক্ষ্য দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা। কিন্তু, ততক্ষণে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসিরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে চলে গেলেও মুসলমানরা পূর্ববঙ্গ গঠনের প্রস্তাবে খুশিই হয়েছিল।
শিলাইদহের জমিদার রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক মন সেটা বুঝেছিল তারও পরে। বঙ্গভঙ্গ ও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। যা নিয়ে তাঁর উপর চরম অসন্তুষ্ট হয় কংগ্রেসের হোমড়াচোমড়া নেতারা। ফলে, ১৯০৫ সালের ১৬ অগস্ট রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বেড়ানো ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল...’ গানটি কেবলমাত্র স্বদেশী গান হয়েই রয়ে গেল। ভারতের অন্তরকে ছুঁতে ব্যর্থ হল। সে কারণে ১৯১১ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ যখন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব খারিজ করে দেন, তখনও ডিভাইড অ্যান্ড রুলের মর্মার্থের গিঁট ছিঁড়ে ফেলতে পারেনি বাঙালি। কী পূর্বের, কী পশ্চিমের বাঙালি মুসলমানরা। রবীন্দ্রনাথও সেই আমলে এ ব্যাপারে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন দেশের হিন্দু নেতাদের। কিন্তু তখন কেউ তাঁর কথা শোনেনি।
কিংবদন্তি অনুসারে, চিতোরের রাণী কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়েছিলেন, তাঁকে তাঁর রাজ্যকে আসন্ন আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সাহায্য করার জন্য। হুমায়ুন রানির আবেদনে সাড়া দেন এবং তাঁর রাজ্য রক্ষা করেন।
রামায়ণ অনুযায়ী, ভগবান রাম সমস্ত বানর সেনাকে ফুল দিয়ে রাখি বেঁধে ছিলেন। এছাড়া, বলিকে ভাই হিসেবে মেনে লক্ষ্মী রাখি পরিয়েছিলেন তাঁকে, যাতে সে উপহার স্বরূপ বিষ্ণুকে স্বর্গে তাঁর কাছে ফিরে যেতে বলে। রামায়ণের পর মহাভারতেও রাখির কথা মেলে।
সুভদ্রা কৃষ্ণের ছোট বোন। তা সত্ত্বেও রাজা দ্রুপদকন্যা তথা পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী দ্রৌপদী ছিলেন কৃষ্ণের অতীব স্নেহভাজন। একদিন সুভদ্রা অভিমানের সুরে কৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন, এর কারণ কী। উত্তরে কৃষ্ণ জানান, ঠিক সময়ে এর কারণ তুমি বুঝবে। এর কিছুদিন পর শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে রক্ত ঝরছিল, তা দেখে সুভদ্রা রক্ত বন্ধ করার জন্য কাপড় খুঁজছিলেন, কিন্তু কোথাও কোনও পাতলা সাধারণ কাপড় পাচ্ছিলেন না।
এর মাঝে দ্রৌপদী সেখানে এসে দেখেন কৃষ্ণের হাত থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। সেই ঘটনা দেখামাত্রই বিন্দুমাত্র দেরি না করে, নিজের মূল্যবান রেশমি শাড়ি ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাত বেঁধে দেন। কিছুক্ষণ পর রক্ত পড়া বন্ধ হয়। তখন শ্রীকৃষ্ণ বোন সুভদ্রাকে ডেকে বলেন- এখন বুঝতে পেরেছ কেন আমি দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করি? ভাইও তার বোনকে পৃথিবীতে সর্বাধিক স্নেহ করে, সারাজীবন তাঁকে রক্ষা করে থাকে। পাশা খেলায় হেরে দ্রৌপদী যখন চরম হেনস্তার মুখে, তখন শেষ ভরসা হিসেবে তিনি ভ্রাতৃপ্রতিম কৃষ্ণকেই শরণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম কলঙ্ক থেকে রক্ষা করেন।
আরও একটি পৌরাণিক কাহিনি হল, একবার রাখিবন্ধনের দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়। তাদের কোনও বোন ছিল না। তারা বাবার কাছে একটা বোনের বায়না ধরে। গণেশ তখন তাঁর দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের জন্য দিব্যাগ্নি থেকে একটি কন্যার জন্ম দেন। তিনি হলেন গণেশের মেয়ে সন্তোষী। সন্তোষী তখন শুভ ও লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন।
কিংবদন্তি আছে যে, যমুনা দেবী যমের হাতে রাখি বেঁধেছিলেন, যা যমকে মুগ্ধ করে এবং তিনি যমুনা এবং তাঁর ভাইদের অমরত্বের বর দেন। অন্য একটি কাহিনি রয়েছে, দৈত্যরাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বলির রাজ্যরক্ষা করতে চলে এসেছিলেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। লক্ষ্মী বলিকে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যতদিন না স্বামী ফিরে আসেন, ততদিন যেন বলি তাঁকে আশ্রয় দেন। বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষ্মীকে আশ্রয় দিতে রাজি হন। শ্রাবণ পূর্ণিমা উৎসবে লক্ষ্মী বলিরাজার হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। বলিরাজা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী আত্মপরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এতে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। বলিরাজা বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিটি বোনেরা রাখিবন্ধন হিসেবে পালন করে।
কারও কারও মতে, এই তিনটি গিঁটের প্রতীক হলেন ত্রিদেব। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। প্রথম গিঁটটি পড়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার প্রতীকী হিসেবে। যার অর্থ জীবনে অখণ্ড যাত্রা, সৌভাগ্য ও শক্তিতে পরিপূর্ণতা লাভের কামনা। দ্বিতীয় গিঁটটি হলে ভগবান বিষ্ণুর প্রতীক। যাঁকে ব্রহ্মাণ্ডের রক্ষাকর্তা বলা হয়। তিনি যেন ভাইকে সমস্তরকম বিপদ থেকে রক্ষা করেন, আশীর্বাদ করেন। ভাই যেন সমৃদ্ধশালী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। তৃতীয়টি দেবাদিদেব মহাদেবের নামে। সমস্ত রকমের দুষ্টশক্তির হাত থেকে ও অশুভ দমন করে ভাইকে রক্ষার প্রতীক। এছাড়াও এই তিনটি গিঁটকে ভাইবোনের পারস্পরিক ভালবাসা, বিশ্বাস ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়। আগামী শনিবার রাখি পূর্ণিমা, তাই এখন থেকেই স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে সাজিয়ে রাখুন মনের ডালা। একটি সুতোয় বাঁধা পড়ে থাক আজন্ম থেকে আমৃত্যুর অটুট বাঁধন।