বিচারপতির আসনে থাকা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন অভিযোগ এবং তার পরিণতিতে এই পদত্যাগ দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আরও একবার প্রশ্ন তুলে দিল। আদালতের অন্দরে এবং রাজনৈতিক মহলে এখন এই পদত্যাগ ঘিরেই চলছে জোর চর্চা।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত ভার্মা
শেষ আপডেট: 10 April 2026 14:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের বিচারবিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অধ্যায়ের যবনিকা পড়ল। সংসদীয় ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার আগেই পদত্যাগ করলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত ভার্মা (Justice Yashwant Varma)। বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল সরাসরি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র (Justice Yashwant Varma Resignation) পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি।
দিল্লির বাংলো থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল তাঁর। তাঁর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। প্রক্রিয়া (Impeachment of Allahabad High Court Judge) চলাকালীন এই পদত্যাগ প্রশ্ন তুলছে আইনি মহলে।
কী লেখা আছে পদত্যাগের চিঠিতে?
রাষ্ট্রপতিকে লেখা সংক্ষিপ্ত অথচ গম্ভীর চিঠিতে বিচারপতি ভার্মা তাঁর এই সিদ্ধান্তের কোনও সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি। তিনি লিখেছেন, "কেন আমি এই পদত্যাগপত্র দিতে বাধ্য হলাম, সেই কারণগুলো জানিয়ে আপনার দফতরকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না। তবে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে আমি এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছি। এটি অবিলম্বে কার্যকর করা হোক।"
ইমপিচমেন্ট এড়ানোর কৌশল?
বিচারপতি ভার্মার এই আচমকা পদত্যাগের ফলে তাঁর বিরুদ্ধে চলা ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়াটিও কার্যত মাঝপথেই থেমে যাবে বলে লোকসভা সচিবালয় সূত্রে খবর। আইনজ্ঞদের মতে, এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ, সংসদের মাধ্যমে অপসারিত হলে তিনি পেনশন এবং অন্যান্য অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতেন। কিন্তু স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার ফলে তিনি একজন হাইকোর্ট বিচারপতির প্রাপ্য সমস্ত সুবিধাই ভোগ করতে পারবেন।
লুটিয়েন্স দিল্লির সেই বাংলো সংক্রান্ত গোটা বিতর্কের সূত্রপাত গত বছর ১৪ মার্চ। সেই সময় যশবন্ত ভার্মা দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। লুটিয়েন্স দিল্লিতে তাঁর সরকারি বাসভবনের সহায়কদের থাকার ঘরের পাশের একটি স্টোররুম থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। সেই সময় সস্ত্রীক ভোপালে ছিলেন বিচারপতি। উদ্ধার হওয়া টাকার বান্ডিলগুলোর কিছু অংশ পোড়া অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি ওঠে। যদিও বিচারপতি ভার্মা প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে, ওই স্টোররুমের চাবি অনেকের কাছেই থাকে এবং ওই টাকার সঙ্গে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনও যোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া পদক্ষেপ
বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা শুরু হতেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিন বিচারপতির একটি ইন-হাউস কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার কাছে সেই কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর বিচারপতি বর্মার কাছ থেকে সমস্ত বিচারবিভাগীয় কাজ কেড়ে নেওয়া হয়। তাঁকে দিল্লি থেকে সরিয়ে তাঁর আদি হাইকোর্ট এলাহাবাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নজিরবিহীনভাবে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছিল।
সংসদীয় সক্রিয়তা ও পদত্যাগ
গত বছরের জুলাই মাস থেকে তাঁকে বিচারপতি পদ থেকে সরানোর জন্য ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হয়। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন। সম্প্রতি সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও জানিয়েছিলেন যে, এই প্রক্রিয়াটি বিচারধীন এবং সরকার রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু রিপোর্ট আসার আগেই ইস্তফা দিয়ে সেই অধ্যায় বন্ধ করে দিলেন যশবন্ত ভার্মা।
বিচারপতির আসনে থাকা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন অভিযোগ এবং তার পরিণতিতে এই পদত্যাগ দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আরও একবার প্রশ্ন তুলে দিল। আদালতের অন্দরে এবং রাজনৈতিক মহলে এখন এই পদত্যাগ ঘিরেই চলছে জোর চর্চা।