গানটিতে নেই বিজয়ের দাম্ভিকতা, নেই রাজনৈতিক রং, আছে শুধু ত্যাগের কৃতজ্ঞ স্বীকৃতি। তাই এটি সমানভাবে জায়গা পায় স্কুল, সেনানিবাস, সরকারি মঞ্চ, পাড়ার মাঠে।
.jpeg.webp)
লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া গানে কেঁদেছিলেন নেহরু।
শেষ আপডেট: 14 August 2025 17:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বাধীনতা দিবস (Independence Day) বা প্রজাতন্ত্র দিবস এলেই যেন এক অদৃশ্য সময়সূচি মেনে শুরু হয় সেই সুর— ‘এ মেরে ওয়াতন কে লোগো’। স্কুলের প্রাঙ্গণ থেকে সরকারি অনুষ্ঠান, হাউসিং সোসাইটির উঠোন থেকে রেডিও-টিভির সম্প্রচার, যেখানেই বাজুক, মানুষের মন ছুঁয়ে যায় কয়েক মিনিটের এই গান।
এই গান তৈরি হওয়ার আগে, জাতীয় স্মৃতিতে এমন কোনও সুর ছিল না, যা একসঙ্গে শোক, গর্ব আর কৃতজ্ঞতাকে জাগিয়ে তোলে সকলের মনে। এই গানের হাত ধরে যেন দেশপ্রেমের আবেগে এক পরিবর্তন আসে, ১৯৬৩ সালের এক শীতের সন্ধ্যায়। সেদিনই লতা মঙ্গেশকর প্রথম গানটি গেয়ে শোনান সরাসরি।
১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পরে দেশের বুকে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। সেই যুদ্ধের খবর ও শহিদ সেনাদের ছবি দেখে মর্মাহত হয়েছিলেন কবি প্রদীপ। সেই আবেগ থেকেই জয়ধ্বনি নয়, তিনি লিখেছিলেন এক জনতার শোকগাথা। যেখানে প্রত্যেক ভারতবাসীকে ডেকে নেওয়া হয়েছে স্মৃতিচারণে।
গানটির প্রথম লাইন ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগো...’ এ যেন প্রত্যেক শ্রোতাকে ব্যক্তিগতভাবে আহ্বান জানায়, শোকে-শ্রদ্ধায় সামিল হতে। গানটি লেখার পরে যে রয়্যালটি আসে, তা শহিদ পরিবারের কল্যাণে দান করেন গীতিকার, কবি প্রদীপ।
সুরকার সি. রামচন্দ্র সুর বাঁধেন মৃদু মিছিলের তালে। সুরে অযথা জাঁকজমক নেই—হারমোনিয়াম, তারযন্ত্র আর মাপা ছন্দে এগিয়ে চলে সঙ্গীত।সেখানে শব্দের মাঝের নিঃশ্বাসই যেন আসল শক্তি। লতা মঙ্গেশকরের স্বচ্ছ, অনুনয়ভরা কণ্ঠ সেই সুরকে পৌঁছে দেয় রীতিমতো প্রার্থনার উচ্চতায়। উঁচু সুরেও কোথাও বাড়াবাড়ি নেই— বরং শব্দগুলির ওজনই হয়ে ওঠে গানটির প্রাণ।
শোনা যায়, প্রথমে নিজেকে সামলাতে পারবেন কি না ভেবে গাইতে দ্বিধা করেছিলেন, পরে সুরের আবেগেই জয়ী হন।
১৯৬৩ সালের ২৬ জানুয়ারি, দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়াম। রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ও প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উপস্থিত। শহিদ পরিবারগুলি তখনও শোকসাগরে। লতা মঙ্গেশকর সাদামাটা শাড়ি পরে মঞ্চে উঠলেন, বিন্দুমাত্র চলচ্চিত্রি আড়ম্বর ছাড়াই। গাইলেন সেই গান।
গান শেষ হওয়ার পরে নেহরুর চোখে জল! তিনি নিজে লতাজিকে বলেন, 'তুমি আমাকে কাঁদালে।' সেই মুহূর্তেই যেন গানটি হয়ে ওঠে জাতীয় স্মৃতির অংশ।
অনেক দেশাত্মবোধক গানের মতো এটি কোনও সিনেমার অংশ নয়। প্রথমবার গাওয়া হয়েছিল সরাসরি জনতার সামনে, পরে রেকর্ডে বাঁধা হয়। ফলে গানটি শুরু থেকেই মানুষের মঞ্চ, স্কুলের অ্যাসেম্বলি, শহিদ স্মরণসভা— এসবের অন্তর্গত হয়ে ওঠে।
১৯৬০-৭০-এর দশকে অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শন জাতীয় দিবসে গানটি নিয়মিত সম্প্রচার করত। স্কুল, এনসিসি ক্যাম্প, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এটি হয়ে ওঠে আবশ্যিক প্রথম গান। আজও শহিদ দিবস থেকে শুরু করে বিপর্যয়ের মোমবাতি মিছিলে, স্বাধীনতা দিবসের সকাল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ডে—সবখানেই এর আবেগ অটুট।
গানটিতে নেই বিজয়ের দাম্ভিকতা, নেই রাজনৈতিক রং, আছে শুধু ত্যাগের কৃতজ্ঞ স্বীকৃতি। তাই এটি সমানভাবে জায়গা পায় স্কুল, সেনানিবাস, সরকারি মঞ্চ, পাড়ার মাঠে। প্রথম সুর উঠতেই সবাই যেন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়, গলায় আবেগ জমে। এ গান যেন জাতীয় সঙ্গীতের পরেই আরও একটি সম্মিলিত দেশপ্রেমের বাঁধনে বাঁধে সকলকে।
স্বাধীনতা দিবসের উজ্জ্বল পতাকার পাশে শহিদদের ত্যাগের স্মৃতি যেন ভুলে না যায়, সেই দায়িত্বই পালন করে ‘মেরে ওয়াতন কে লোগো’। ইতিহাসকে আবেগে রূপান্তরিত করে, আর সেই আবেগ থেকে জন্ম নেয় নতুন প্রজন্মের দায়িত্ববোধ। তাই গানটি আজও ভারতের অন্যতম প্রিয় দেশাত্মবোধক সঙ্গীত— যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশ মানে শুধু পতাকা নয়। দেশ মানে, দেশের জন্য অকালে ঝরে যাওয়া সেই প্রাণগুলোও।