দর্শকদের এতদিনের আকুতি পূর্ণতা পেল দেব-শুভশ্রীর উষ্ণ চুম্বনে।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 19 August 2025 18:16
ছবি: ধূমকেতু (Dhumketu 2025)
চরিত্র চিত্রণে: দেব, শুভশ্রী, রুদ্রনীল, পরমব্রত, দুলাল,অলকানন্দা ও চিরঞ্জিত
পরিচালনা: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
প্রযোজনা: দাগ ক্রিয়েটিভ মিডিয়া ও দেব এন্টারটেনমেন্ট ভেঞ্চারস
দ্য ওয়াল রেটিং: ৯/১০
'ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি
পেরিয়েছ দেশ-কাল জানো নাকি এসময়...'
দুটো জীবন যদি কোনও মানুষকে বাঁচতে হয়, দ্বিতীয় জীবন থেকে প্রথম জীবনে সে কী ফিরতে পারে? সেই নির্যাসেই তৈরি সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'ধূমকেতু'।

উত্তম-সুচিত্রা থেকে অমিতাভ-রেখা বা প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী থেকে দেব-শুভশ্রী (Dev_Subhasree),যাঁদের জুটি পর্দাতে যতখানি সুপারহিট, ব্যক্তিগত জীবনও ততখানি চর্চিত। জুটি কিন্তু সহজে গড়ে ওঠে না। আর 'জুটি' এমন একটা জিনিস, যা বাংলা ছবির বক্সঅফিসে চিরকাল বড় ফ্যাক্টর। সেই জুটি যদি নায়ক-নায়িকার বহু যুগ পর একসঙ্গে ফিরে আসা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। শুধু তাই নয়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিতে প্রথম দেব-শুভশ্রী এবং এক দশক আগের ছবি রিলিজ করল। যা বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটাল দর্শকদের কাছে। কেমন হল কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'ধূমকেতু'? দেব-শুভশ্রী জুটি কতখানি সফল হতে পারলেন কৌশিকের ছবিতে?
এই গল্পের নায়ক ভানু। যাকে দুটো জীবন বাঁচতে হয়। দ্বিতীয় জীবনে, যার প্রথম জীবনের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু সে সেই প্রথম জীবনের ঘরেই ফিরতে চায়। ভানু আজ উগ্রপন্থী। তাঁর ভানু নামটাও হারিয়ে গিয়েছে। সম্পূর্ণ ফ্ল্যাশব্যাকে চলতে থাকে ছবির কাহিনি। বৃদ্ধের ভূমিকায় দেব-এর এন্ট্রি পর্দায়। সত্যি কী দেব বৃদ্ধ! ছদ্মবেশে ভানু হাজির হয় তাঁর বাল্যবন্ধু যোগেশের আস্তানায়। যোগেশ অবাক হয়ে যায় এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক ৫০ পেরিয়ে বুক ডন দেয় কী ভাবে? বন্ধুর জহুরির চোখ চিনে নেয় এ তো তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধু ভানু। অথচ রটনা দশ বছর আগেই নিরুদ্দেশ হওয়া ভানু মারা গিয়েছে। এদিকে ভানুর বাবা-মা আর স্ত্রী রূপার (শুভশ্রী) জীবন দশ বছরে বদলে গিয়েছে। রূপার আবার বিয়ে ঠিক করেছে ভানুর বাবা-মা। রূপা আজ তাদের বৌমা নয়, মেয়ে। যেখানে ছেলেই নেই মেয়েটার জীবন কেন শেষ হবে! যখন ভানু বৃদ্ধের ছদ্মবেশে ফিরে যেতে যায় ঘরে তখন বারবার আঘাত পায়। নিজের স্ত্রীকে অন্যের হয়ে যেতে। কিন্তু বাবা-মা ও স্ত্রী রূপা আজও ভানুকে ভুলতে পারেনি। ভানু কী প্রমাণ করতে পারে তাঁর আপনজনদের কাছে সে মৃত নয়? কোন কারণে সাদামাঠা জীবন থেকে ভানুকে উগ্রপন্থী হয়ে যেতে হল? বাবার নাম সূর্য আর তাঁর দুই ছেলের নাম রবি ও ভানু? সূর্যের নামে সবার নাম হয়েও তাঁদের জীবন কোন অভিশাপে অন্ধকারে ঢেকে গেল? আর কী ভানু-রূপার মিল হয়? এই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে দেব-শুভশ্রীর 'ধূমকেতু'। গল্প যত এগোতে থাকে পরতে পরতে খুলতে থাকে নানা প্রশ্নের জট।
/indian-express-bangla/media/media_files/2025/06/23/dev-subhashree-dhumketu-2025-06-23-12-05-52.jpg)
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালিত ছবি চিরকালই দর্শকদের মন জয় করে নেয়। কিন্তু 'ধূমকেতু' কৌশিকের এমন এক ছবি যা মূলধারা আর সমান্তরাল ছবির ঠিক মাঝখানে অবস্থান করে। অ্যাকশন, ড্রামা, ইমোশন, রোম্যান্স সব মিলে মিশে একাকার। কিন্তু ভীষণ শৈল্পিক। তেমনই মনকে নাড়া দেওয়া সংলাপ। এক দশক আগে দেব-শুভশ্রী একেবারেই মেনস্ট্রিম ছবিতেই আইকনিক ছিলেন। এই জুটিকে এমন ছবিতে প্রথম ভেবেছিলেন কৌশিক। সেই ছবি বহু প্রতীক্ষার পর সামনে এল।
'আজকে বলবে কালকে দেখা
কালকে বলবে পরশু একা
পরশু বলবে ভুলে গেছি যা
সবই যখন গেছ বুঝে
নাও না নিজের জবাব খুঁজে
যাও না বাবা আর তো পারি না...'
'ধূমকেতু' ছবিতে পর্দায় দেব-শুভশ্রীর আবির্ভাব যেন দখিন হাওয়া বইয়ে দিল। আগের দেব, আগের শুভশ্রী কিন্তু পরিণত অভিনয়ে। ঠিক ছবির গল্পের ভানু-রূপার মতোই বর্তমানেও দেব-শুভশ্রী এক জীবনে দুটো জীবন বাঁচছেন। ছবি দেখতে দেখতে সেই প্রণয়-বিরহের রেশ যেন দর্শকদের মনেও এসে পড়ল।

দেব এই সময় দাঁড়িয়ে নিজেকে নানা চরিত্রে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু 'ধূমকেতু' র দেব তারও আগের। হাসি-কান্না-আবেগ-প্রেম একইসঙ্গে দেবের অভিনয়ে খেলা করেছে। তরুণ থেকে বৃদ্ধ চরিত্রে দেবের পরিণত অভিনয় সব শ্রেণীর দর্শকদের মন জয় করে নেবে, চোখে জল আনবে। ছবির শুরু থেকে শেষ দেবের অভিনয়ের নানা শেডস ধরা পড়ল। এমনকি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ওয়ার্কশপে অত বছর আগে দেবের বাংলা উচ্চারণ যথেষ্ট পরিণত।
ঠিক একই কথা শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্য প্রযোজ্য। তখন তিনি 'গৃহপ্রবেশ','ইন্দুবালা ভাতের হোটেল','সন্তান','বৌদি ক্যান্টিন' এর মতো ছবি করেননি। 'ধূমকেতু' তে শুভশ্রীর স্নিগ্ধ শান্ত অভিনয় যেন 'চাঁদের চোখে বুলিয়ে গেল ঘুমের ঘোর, সে প্রাণের কোথায় দুলিয়ে গেল ফুলের ডোর।' কোন পুরুষকে সে বেছে নেবে জীবনে এই দোলাচল শুভশ্রীর সংযত অভিনয়ে স্পষ্ট। তেমনই মিষ্টি লেগেছে তাঁকে রোম্যান্সের দৃশ্যে।
দেব-শুভশ্রীর রসায়ন যা দেখতে দুই বাংলার দর্শক উদগ্রীব তাঁদের মন ভরাবে, চোখের পাতা ভেজাবে 'ধূমকেতু'। দর্শকদের এতদিনের আকুতি পূর্ণতা পেল দেব-শুভশ্রীর উষ্ণ চুম্বনে।

তবে 'ধূমকেতু' ছবিতে শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন দেবের বন্ধু যোগেশের চরিত্রে রুদ্রনীল ঘোষ। রুদ্রনীল যে কত বড় অভিনেতা সেই ধার ভার বার করে এনেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকার মান-অভিমান হয় না, দুই বন্ধুরও হয়। এই ছবিতে দেব-শুভশ্রীর পাশাপাশি দেব-রুদ্রনীলের কেমিস্ট্রি বড় ম্যাজিক। বন্ধু ভানুর প্রেমকে পূর্ণতা দিতে যোগেশ পাঁচিলে উঠতে গিয়ে তাঁর এক পা হারিয়েছিল। ছবিতে রুদ্রনীলের একটি নাচের দৃশ্য আছে। রুদ্রনীল খুড়িয়ে খুড়িয়ে যে ভাবে আবেগঘন দৃশ্যে নাচলেন তা চোখ মন দুই ভেজায়। প্রতিটি দর্শক প্রথম শো দেখে হল থেকে বেরিয়ে সবার আগে রুদ্রনীলের স্তুতি করছেন। এক দশক আগের ছবি দিয়ে এই সময়ে অভিনেতা রুদ্রনীল আবার ফিরে এলেন।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে ভীষণই যথাযথ। যাকে ভিলেন করে তোলেননি কৌশিক। আবার দেবকেও ভিলেন দেখাননি। বাবা-মায়ের চরিত্রে মনে দাগ কাটলেন দুলাল লাহিড়ি ও অলকনন্দা রায়। ওঁরা পোড় খাওয়া অভিনেতা ভাল অভিনয় করবেনই। কিন্তু দু'জনকেই খুব ভাল ভাবে বহুদিন পর ব্যবহার করা হল। তবে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী একেবারেই গৌণ রয়ে গেলেন। তাঁর মতো অভিনেতার কিছু করার ছিল না।
'ধূমকেতু' মিউজিক্যাল হিট ছবিও হয়েছিল থাকবে। অনুপম রায়ের সুরে ও ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর আবহে প্রতিটি গান মন ছুঁয়ে যায়। সবথেকে শুরুতেই মন ভাল করে অরিজিৎ সিং-শ্রেয়া ঘোষালের 'গানে গানে'। ছবির ক্লাইম্যাক্স গাঢ় করে ঈশান মিত্রের কণ্ঠে 'হবে না দেখা'। তেমনই মা-ছেলের মায়ায় ভরা গান অনুপম রায়ের 'মা'।
নচিকেতার গলায় এই ছবির গান সেই 'চ্যালেঞ্জ' ছবির নস্টালজিয়া টেনে আনল।

'ধূমকেতু'র প্রতিটি ফ্রেম চোখকে আরাম দেয় সৌমিক হালদারের দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি। দেবের বৃদ্ধ মেকআপ যা রীতিমতো দশ বছর ধরে ঝড় তুলে রেখেছে তা আজ মুক্তি পেল। রূপটানে বিক্রম গৈকান্দ এখন শিরোনামে থাকবেন।
'ধূমকেতু'র খামতি বলতে যে ভাবে অতীতের ঘটনা ছবিতে আসছে সেই কারণগুলো যথাযথ ভাবে ছবিতে তুলে ধরা হয়নি। কোথাও একটু কারণ গুলো আলগা ছবিতে। চিত্রনাট্য আর একটু টানটান হতে পারত। তবে 'ধূমকেতু' আজ এক আবেগ। তাই এই ছবির ইতিবাচক দিক বেশি।
বাংলা ছবির সকাল সাতটায় প্রতিটি শো হাউসফুল যা বিরল মুহূর্ত। রাত দুটোতেও হাউসফুল। আজও যে জুটির ম্যাজিক বাংলা ছবিতে আছে তা আবারও প্রমাণ হল। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকের হাতে এই ছবি হওয়ায় শ্রেষ্ঠ অভিনয়ে সমৃদ্ধ হল এই জুটি। মন বলল 'সাত পাকের বাঁধনের চেয়ে, প্রতীক্ষার এ বাঁধন কম কিসে'।