শিক্ষকতার কয়েক বছরেই কুলদীপ সিদ্ধান্ত নেন, শুধু রুটিন পড়ানো নয়, পড়ুয়াদের হাতেকলমে শিখিয়ে, নতুন ভাবে বিজ্ঞানের পাঠকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

গ্রাফিএক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 September 2025 17:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জম্মু-কাশ্মীরের (Jammu and Kashmir) জিন্দ্রা এলাকার সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক কুলদীপ গুপ্তা (Kuldeep Gupta) আগামী ৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী দ্ৰৌপদী মুর্মুর হাত থেকে জাতীয় শিক্ষক সম্মাননা (National Teachers award 2025) পেতে চলেছেন। শিক্ষক দিবসে (Teachers day) এই সম্মাননা, নিঃসন্দেহে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে এক বিরাট সাফল্যের মুহূর্ত হতে চলছে।
শিক্ষা খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কাশ্মীর সরকার ২০২১ সালে কুলদীপকে ‘সেরা শিক্ষক’ পুরস্কার দিয়েছিল। এবার তিনি ‘জাতীয় শিক্ষক’ পুরস্কার পাচ্ছেন।
বিষ্ণা গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে কুলদীপ জম্মুতেই প্রাথমিক শিক্ষার ধাপ শেষ করেন। বাবা বানারসি লাল গুপ্তা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখা, মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেসের (MES) যুক্ত ছিলেন।
৫৭ বছর বয়সি কুলদীপ বাড়ির চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ, তাই জুলজি নিয়ে মাস্টার্স করার পরে এম.এড করেন। ১৯৯২ সাল নাগাদ তিনি তার তাঁর গ্রামেরই এক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, শুধু রুটিন পড়ানো নয়, পড়ুয়াদের হাতেকলমে শিখিয়ে, নতুন ভাবে বিজ্ঞানের পাঠকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
১৯৯৫ সালে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সাতওয়ারিতে পোস্টিং পাওয়ার পর পড়ুয়াদের মধ্যে তো বটেই, শিক্ষকদের মধ্যেও দারুণ জনপ্রিয়তা পান। তিনি তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে পড়ুয়াদের হাতেকলমে শিখিয়ে, নতুন ভাবে বিজ্ঞানের পাঠক্রম চালু করেন। কুলদীপের কথায়, “আমি চাই শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে আগ্রহী হোক, যাতে তাদের জ্ঞানের বিকাশ হয়।”
কুলদীপ সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে ‘চিলড্রেনস সায়েন্স কংগ্রেস’কে জনপ্রিয় করে তোলার জন্যও পরিচিত। ২০০০ সালের আগে এই প্রতিযোগিতায় প্রধানত কিছু বেসরকারি স্কুলের পড়ুয়ারাই অংশ নিত, কিন্তু তিনি ডিরেক্টরেট অফ স্কুল এডুকেশন জম্মুর (DSEJ) সহায়তায় সরকারি স্কুলকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন।
হঠাৎ এমন বাঁধাধরা শিক্ষার ছকের বাইরের কথা ভাবলেন কেন কুলদীপ?
তাঁর কথা, “আমরা চাইতাম, বইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব গড়ে উঠুক। এটি শিক্ষার্থীদের স্থানীয় সমস্যার সমাধান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করতে শেখায়।”
তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষা বিভাগ জম্মু অঞ্চলের ১০টি জেলার সব স্কুলে এই প্রোগ্রাম চালু করে। এরপর প্রতিটি জেলায় চিলড্রেনস সায়েন্স কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়, যার পরবর্তী ধাপে রাজ্য ও জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতা হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সহায়তায়।
২০০৯ সালে তিনি জম্মু অঞ্চলের চিলড্রেনস সায়েন্স কংগ্রেসের একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর হন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম তদারকি ও কার্যক্রমমূলক বই প্রস্তুত করার দায়িত্ব পান।
২০১৭ সালে তিনি স্টেট কাউন্সিল ফর এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (SCERT) এবং জেলা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (DIET) এর রিসোর্স পারসন হন এবং জম্মু অঞ্চলের ১৫০০-এর বেশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, “এটি একটি অনন্য সুযোগ ছিল। এই সময়ে আমি NCERT বইগুলো প্রুফরিড করেছি, NSS এর কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেছি এবং জাতীয় ইন্টিগ্রেশন ক্যাম্পে অংশ নিয়েছি।”
কুলদীপ তাঁর ৩০ বছরের শিক্ষকতার জীবনে ১০টি স্কুলে পড়িয়েছেন, প্রধানত জম্মুর গ্রামীণ এলাকায়। তিনি মনে করেন, তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল কম খরচে ও বিনামূল্যে পড়ানো, পড়ুয়াদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব তৈরি করতে পারা এবং ধারণাগত শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়া।
তিনি বলেন, “‘কম খরচে ও বিনামূল্যে শিক্ষাদান’ বা ‘কবার সে জুগাড়’ (ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে নতুন জিনিস বানানো) এর মাধ্যমে পড়ুয়ারা সহজে হাতের কাছে থাকা জিনিস ব্যবহার করে বিজ্ঞানের ধারণা শিখতে পারে। জটিল ল্যাবরেটরির প্রয়োজন নেই।”
জিন্দ্রা সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে তিনি একটি মিনি ল্যাবও তৈরি করেছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজে শিখতে পারে। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতির কারণে অনেক স্কুলছুট পড়ুয়া আবার স্কুলে ফিরেও এসেছে।
তিনি বলেন, “আমার এই প্রচেষ্টায় সরকার স্বীকৃতি দিচ্ছে আমি খুশি, এবং আমার পরিবারও খুশি। এটি সম্ভব হয়েছে আমার পড়ুয়া, সহকর্মী ও যেকোনও প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় প্রধানদের সহায়তায়। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এই পুরস্কার অসম্পূর্ণ।”