যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যাহত। রেস্তরাঁ, হোটেল, পরিবহণ ও শিল্পে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। গিগ ওয়ার্কারদের আয়ও কমতে শুরু করেছে।

ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 12 March 2026 15:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিমান পরিষেবা কার্যত বন্ধ, জলপথে অনিশ্চয়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পণ্য আটকে, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকটের মুখে দেশ। বাইরে থেকে সব কিছু সচল দেখালেও ভিতরে ভিতরে যেন অচল হয়ে পড়ছে অর্থনীতির চাকা। এর ফলে কর্মচ্যুতির আশঙ্কাও ক্রমশ বাড়ছে। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন যে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু রেস্তরাঁয় তালা ঝুলেছে। অনলাইনে খাবার ডেলিভারির অর্ডার কমেছে, ফলে আয় কমেছে গিগ ওয়ার্কারদেরও। পাহাড় থেকে সমুদ্রসৈকত, পর্যটনকেন্দ্রগুলির হোটেল ব্যবসায়ীরাও এখন উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কয়েক দিনের মধ্যেই বহু মানুষের কাজ থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ভারতের মোট জিডিপি-র প্রায় তিন শতাংশ ব্যয় হয় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রুড অয়েলের জোগান কমতে শুরু করেছে। এর ফলে তেলের দাম বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানির অভাব দেখা দিলে ভারী শিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি ছোট কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। রাস্তায় অটোর সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে, ফলে পরিবহণ ক্ষেত্রেও বেকারত্বের ছায়া ঘনাচ্ছে।
শুধু শিল্প বা পরিবহণই নয়, প্রভাব পড়তে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। মোবাইল ফোন টাওয়ার চালাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সেই জ্বালানি কতদিন পাওয়া যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনই যেন এক নতুন সংগ্রামে পরিণত হতে চলেছে। অনেকটা করোনা মহামারির সময়ের লকডাউনের মতো পরিস্থিতি, তবে এবার বাইরে থেকে সবকিছু চলমান মনে হলেও অর্থনীতির ভিতরে তৈরি হয়েছে এক গভীর অচলাবস্থা। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে সামগ্রিক অর্থনীতি, সব ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করছে এই সংকটের স্থায়িত্ব।
ডেলিভারি এবং অ্যাপ-নির্ভর পরিষেবার ক্ষেত্রেও ইতিমধ্যেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সুইগি, জোমাটো, ব্লিঙ্কিট, র্যাপিডো এবং উবর-এর মতো অ্যাপগুলিতে কাজ করা অসংখ্য কর্মী আছেন, যাঁরা কাজের উপর ভিত্তি করে মাসে প্রায় ১২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। কিন্তু অর্ডার কমে যাওয়ায় তাঁদের কাজও কমতে শুরু করেছে। দক্ষিণ কলকাতার একটি নামী ক্লাব ইতিমধ্যেই খাবারের মেনুতে কাটছাঁটের নোটিস দিয়েছে। মহানগরের কয়েকটি জনপ্রিয় রেস্তরাঁও বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমনই চলতে থাকলে গিগ ওয়ার্কারদের রোজগারই বিপদের মুখে পড়বে। কারণ, অনেক ডেলিভারি কর্মী খাবার পৌঁছে দিতে দু’চাকার যান ব্যবহার করেন। জ্বালানি সংকট বাড়লে সেই কাজও কঠিন হয়ে উঠবে। একই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে অ্যাপ-ভিত্তিক বাইক বা গাড়ি চালকদের মধ্যেও।
শিল্পক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। শিলিগুড়ির একটি কারখানা ইতিমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। হাওড়ার জালান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের এক কর্তা জানিয়েছেন, সেখানেও বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে কাটছাঁট করেছে। আসানসোল–দুর্গাপুর, বড়জোড়া, পুরুলিয়া— এই সব শিল্পাঞ্চলে ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পও সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। ডিজেল ছাড়া ভাটির চুল্লি জ্বালানো সম্ভব নয়, ফলে কাঁচামাল উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ডিজেলের জোগান কতদিন থাকবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় অনেক শিল্পগোষ্ঠী আপাতত ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছে। এর ফলে কর্মী সংকোচনের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
ভারতে গ্যাসের অন্যতম প্রধান জোগানদার কাতার। কিন্তু সেই গ্যাস আসার গুরুত্বপূর্ণ পথই হরমুজ প্রণালী। ফলে এই পথ আটকে গেলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ইতিমধ্যেই বাড়ির রান্নার গ্যাস জোগাড় করতেই অনেককে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সেখানে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের জ্বালানি সরবরাহ কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় শূন্যে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংগঠন ফসমির রাজ্য সভাপতি বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, “পরিস্থিতি সব দিক থেকেই উদ্বেগজনক। যদি এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে তা সামাল দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।”
পূর্বাঞ্চলের হোটেল ও রেস্তরাঁ সংগঠন এইচআরএআই-এর সভাপতি সুদেশ পোদ্দারও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, “জ্বালানি সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই কয়েকটি হোটেল ও রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে রাজ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ কাজ হারাতে পারেন।” পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁরা ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান অয়েলের দ্বারস্থ হয়েছেন।
মিষ্টি শিল্পও এই সংকটের বাইরে নয়। বড় সংস্থাগুলি বয়লারের সাহায্যে উৎপাদন চালালেও ছোট ও মাঝারি মিষ্টির দোকানগুলি মূলত গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের অভাব দেখা দিলে উৎপাদন চালানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই শিল্পেও কয়েক লক্ষ মানুষ কর্মরত। পাশাপাশি রয়েছে বহু আনুষঙ্গিক জোগানদারের আর্থিক নির্ভরতা। এরই মধ্যে কেন্দ্র সরকার গ্যাসের বিশেষ ভর্তুকিও তুলে নিয়েছে। ফলে জোগান কমে গেলে সমস্যার মাত্রা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন প্রখ্যাত মিষ্টি প্রস্তুতকারক সংস্থার কর্ণধার ধীমান দাশ।
সব মিলিয়ে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্র এখন এক অত্যন্ত তেতো বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। কাজ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ। প্রাণঘাতী করোনা ফেরেনি, লকডাউনও নেই। তবু ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ের সরাসরি অংশ না হয়েও যেন এক নিঃশব্দ অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশ এবং তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাতেও।