ভারতের সঙ্গে সরাসরি কোনও সম্পর্ক না থাকলেও ইরানকে কেন্দ্র করে ইজরায়েল ও আমেরিকার সম্পর্কের অবনতির আঁচ এ দেশের নানা ক্ষেত্রে পড়ছে। এ বারে ব্যবসা হারানোর সিঁদুরে মেঘ দেখছে রফতানি ব্যবসায় যুক্ত ভারতীয় চা শিল্পের একাংশ।

সিঁদুরে মেঘ দেখছে রফতানি ব্যবসায় যুক্ত ভারতীয় চা শিল্পের একাংশ
শেষ আপডেট: 28 March 2026 19:30
দিল্লি থেকে তেহরানের দূরত্ব ২৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি। কিন্তু ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও ইরানকে কেন্দ্র করে ইজরায়েল ও আমেরিকার সংঘর্ষের (Iran Israel conflict impact) আঁচ এ দেশের নানা ক্ষেত্রে পড়ছে। এ বারে ব্যবসা হারানোর সিঁদুরে মেঘ (tea export disruption India) দেখছে রফতানি ব্যবসায় যুক্ত ভারতীয় চা শিল্পের একাংশ (Indian tea exports crisis)।
চা শিল্পমহল সূত্রের খবর, কোনও একটি বছরের মে-জুন থেকে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূলত বিভিন্ন দেশে ভারতীয় চা রফতানি চলে। কিন্তু এ বারে ফেব্রুয়ারির শেষ দিন থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ শনিবার পর্যন্ত গড়াল ২৯ দিন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ‘বন্ধু জাহাজ’ ছাড়া অন্য কোনও জাহাজ, মুলত পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইরান। তার জেরে অন্যত্রও জাহাজে পণ্যপরিবহণের খরচ বিপুল বেড়েছে। সেই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে ভারতীয় চায়ের রফতানির যে বড় বাজার রয়েছে, কার্যত এখন পুরোটাই অধরা (Gulf countries tea trade crisis)।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অর্থোডক্স চায়ের বড় ক্রেতা (Iran tea market India)। তবে ইরানের উপরে আগে থেকেই আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় সরাসরি ইরানের সঙ্গে ভারতের চা রফতানি আগেই কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল। তবে দুবাই হল ভারতীয় চা কেনাবেচার বড় কেন্দ্র। সেখান থেকেও আবার সেই চা ইরান ও অন্যান্য জায়গায় রফতানি হয়। দুবাইও সংঘর্ষের মধ্যে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর পাশাপাশি সৌদি আরব, ইরাক, তুরস্কও ভারতীয় চায়ের ক্রেতা। চা শিল্প সূত্রের খবর, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষের জেরে ইরানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের চায়ের রফতানি ব্যবসায় সংশয়ের কালো মেঘ ঘনাচ্ছে।
সাম্প্রতিককালে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের কোথায় কত ভারতীয় চা রফচানি হয়েছে, তার একটা প্রাথমিক হিসাব (চা শিল্প সূত্রে পাওয়া) নীচে দেওয়া হল:


টি বোর্ড এবং চা শিল্পের হিসাবে, উপসাগরীয় এই সব দেশগুলিতে ভারতীয় মোট চা রফতানির প্রায় অর্ধেকই যায়। যেমন ২০২৪ সালের এপ্রিল-ডিসেম্বরে ভারত প্রায় ১৮.৮ কোটি কেজি চা রফতানি করেছিল। তার মধ্যে ওই সব দেশে গিয়েছিল প্রায় ৭.৫৫ কোটি কেজি চা। আর গত বছরের একই সময়ের মধ্যে দেশের চা সেখানে মোট ২১.১ কোটি কেজি চা রফতানি হয়েছে। তার মধ্যে ওই সব দেশে গিয়েছে ৯.২৮ কোটি কেজি চা। এবং ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে ওই কয়েকটি দেশে চায়ের রফতানি কিছুটা বেড়েছিল। ফলে যুদ্ধ আরও বেশিদিন চললে শুধু জ্বালানী আমদানিই নয়, ভারতের চা রফতানিও বেশ কিছুটা ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আপাতত গোটা পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছেন ভারতায় চা রফতানিকারীরা। ইন্ডিয়ান টি এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান অংশুমান কানোরিয়া, দেশের অন্যতম বড় তা রফতানিকারী সংস্থা ভনসালী অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার অনীশ ভনসালির বক্তব্য, গত মরসুমের কিছু রফতানিযোগ্য চা এখনও রয়েছে। কিছুটা জাহাজে মাঝপথে আটকে। কিছু বরাতের টাকা এখনও পাননি রফতানিকারীরা। পাশাপাশি শীতে রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বাগান কিছু দিন বন্ধ থাকে। সম্প্রতি তা ফের খোলার পরে নতুন মরসুম শুরু হয়েছে। তবে রফতানিযোগ্য চায়ের উৎপাদন শুরু হয়ে বাজারে আসতে মে-জুন হয়ে যাবে। হাতে এখনও কিছুটা সময় রয়েছে বটে। কিন্তু ক্রমাগত সংঘর্যের এই পরিস্থিতি সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি করছে।
এই আশঙ্কা সম্পর্কে তাঁরা অবগত জানিয়ে টি বোর্ড অব ইন্ডিয়া-র ডেপুটি চেয়ারম্যান সি মুরুগান বক্তব্য, রফতানিকারীরা কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের কাছে তাঁদের উদ্বেগের কথা পৌঁছে দিতে আর্জি জানিয়েছিলেন। বোর্ড মন্ত্রককে সে কথা জানিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিকল্প বাজার খোঁজা বা অন্য কী করা যায়, খতিয়ে দেখা হবে।
কোনও কোনও মহলে মনে করা হচ্ছে, চা রফতানি কমলে তার কিছুটা দেশের বাজারে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারে চায়ের জোগান বাড়লে চায়ের দামে তার প্রভাব নিয়েও চর্চা চলছে।
তবে সবটা নিয়েই এখনই স্পষ্ট করে কিছু বলার সময় আসেনি বলে মনে করেন বাগান মালিকদের অন্যতম বড় সংগঠন ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হেমন্ত বাঙ্গুর। তাঁর মতে, নতুন রফতানিযোগ্য চা পাতা আসতে এখনও তবে কিছুটা সময় লাগবে। পাশাপাশি যদি বাগানগুলি দেখে, যুদ্ধের জন্য অর্থোডক্স চায়ের রফতানি বাজার পড়ছে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে তার বদলে সিটিসি চা-ও তারা তৈরি করতে সক্ষম। সিটিসি চায়ের রফতানি বাজারে সেই চায়ের জোগান দেওয়া যেতে পারে। তবে দেশের বাজারে কোনও কারণ বাড়তি চায়ের জোগান হলেও তাতে চায়ের দামে প্রভাব পড়ার বা দাম কমার সম্ভবনা নেই বলেও তাঁর দাবি।