পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে ভারতের ছোট-মাঝারি প্লাস্টিক শিল্পে। কাঁচামালের জোগান কমে দাম ৫০-৭০% বেড়েছে, উৎপাদন খরচ বাড়ায় উদ্বেগে প্রায় ৭০ হাজার সংস্থা।

ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 24 March 2026 23:44
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ (Iran War Impact) পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সদ্য সংসদে বলেছেন, তা ভারতকে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এমন কী দেশবাসীকে করোনাকালের মতো প্রস্তুত থাকতেও পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু গৃহস্থ কিংবা হোটেল-রেস্তরাঁর হেঁশেলই নয়, সেই কঠিন চ্যালেঞ্জের আঁচ পাচ্ছে দেশের অনুসারী প্লাস্টিক শিল্পও (Plastic Industry India)। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী মাস থেকে এই শিল্প তীব্র কাঁচামালের সঙ্কটে ভুগবে বলে তাদের আশঙ্কা। যা প্রভাব ফেলতে পারে জনজীবনেও।
ইন্ডিয়ান প্লাস্টিক অ্যাসোসিয়েশন (Indian Plastic Federarion, বা আইপিএফ) সূত্রের দাবি, এর কারণ অশোধিত তেল ও গ্যাস থেকে তৈরি হওয়া প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের জোগানে ঘাটতি। সেই সঙ্গে সেই কাঁচামালের চড়া দর কার্যত নাভিশ্বাস তুলছে গোটা দেশের প্রায় ৭০ হাজার এমন সংস্থা। যাদের ৯০ শতাংশই ছোট-মাঝারি শিল্প। এ রাজ্যের প্রায় ৫০০০ এমন সংস্থায় সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান ৫০ হাজারেরও বেশি। তাঁদের ধরে নিয়ে প্রতি পরিবারে গড়ে চারজন সদস্য ধরলে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের রুটি-রুজি নির্ভর করে যে শিল্পের উপরে।

প্লাস্টিকের অনুসারী শিল্প কারা?
বালতি, মগ, চেয়ার-টেবল, জলের বোতল, জলের পাইপ, পিভিসি পাইপ থেকে সিমেন্ট-খাদ্যসশ্য, ওযুধ-ভোগ্যপণ্যের মতো বিভিন্ন পণ্যের যে প্লাস্টিক মোড়কের প্রয়োজন পড়ে, সবই তৈরি করে এই সব সংস্থা। তাদেরই পেট্রোকেমিক্যালসের অনুসারী শিল্প বলা হয়। অশোধিত তেল ও গ্যাস থেকে শোধনাগারে তাদের জন্য কাঁচামাল পলিমার (যেমন পলি প্রপলিন, পলি ইথিলিন, পিভিসি, পেট ইত্যাদি) তৈরি করে ইন্ডিয়ান অয়েল, রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ়-সহ বিভিন্ন শোধনাগার. এ রাজ্যে ন্যাপথা থেকে ওই পলিমার তৈরি করে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস-ও।
ইরানের ধাক্কা প্লাস্টিকেও
ইরানের সঙ্গে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার সংঘর্ষের জেরে বিশ্ব জুড়েই কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে অশোধিত তেল ও গ্যাসের জোগান। আইপিএফ-এর প্রেসিডেন্ট অমিত আগরওয়াল ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কে কে সেকসরিয়া জানান, সেই অভিঘাত স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়েছে এ দেশের অনুসারী প্লাস্টিক শিল্পেও। ফলে একে তেল ও গ্যাসের জোগান কমেছে। সেই সঙ্গে চড়চড় করে বাড়ছে তাঁদের কারখানার কাঁচামাল, পলিমারের দাম। বিভিন্ন পণ্যের প্রেক্ষিতে ভারত প্রয়োজনীয় পলিমারের ২০-৫০% আমদানি করে থাকে। বাকিটা এ দেশের শোধনাগার থেকে আসে। শুধু মার্চেই এ পর্যন্ত কাঁচামালের দাম গড়ে ৫০-৭০% বেড়েছে। আগের দামের ওঠাপড়া যদি মাসে এক কী দু’বার হত, এখন সপ্তাহে তিন-চারবার করে দাম বাড়ছে। এমনিতে সব সংস্থারই ভাঁড়ারে কিছু কাঁচামাল মজুদ থাকে। কিন্তু আইপিএফ-এর প্রশ্ন, সেই মজুদ ভাণ্ডার দিয়ে কতদিন চালানো যাবে? অনেক সংস্থারই সেই ভাঁড়ার শেষের পথে।
কর্তাদের দাবি, কাঁচামাল কেনার নিয়মে আবার বলা আছে যে বরাতের চুক্তি যবেই করা হোক, যখন তা জোগান দেওয়া হয়, সেই সময়ের দামই দিতে হয় প্লাস্টিক শিল্পকে। অর্থাৎ, আগে চুক্তি হলেও এখন মালের জোগান এলে চড়া দামেই তা কিনতে হবে তাদের। এর ফলে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন খরচ অন্তত ৫০% বেড়েছে. অমিতেদর দাবি, যেমন জলের বোতলের এক কার্টন মোড়ক তৈরির খরচ যদি আগে গড়ে ৬০ টাকা পড়ত, এখন সেটাই বেড়ে পড়ছে ৯০-৯৫ টাকা। ফলে ছোট-মাঝারি সংস্থাগুলির আর্থিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। তাদের পণ্যের দাম সে ভাবে না বাড়লে মুনাফা তলানিতে ঠেকছে। ব্যবসায়িক ভাবে লাভজনক রেখে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না অনেকেরই। উপরন্ত, বিশেষ করে সরকারি দরপত্রের (tender) মাধ্যমে কাজের বরাত পেলে অথবা অনেক বেসরকারি সংস্থার বরাতের ক্ষেত্রেও সেই পণ্য তৈরি করে জোগানের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। কিন্তু পুরোনা দামেই তা বিক্রি করতে হয়। ফলে একদিকে আর্থিক ক্ষতি আর অন্য দিকে, জোগানে দেরি হলেও খেসারত দিতে হয় প্লাস্টিক সংস্থাকে। এ ছাড়া অনেক কারখানাতেই পণ্য তৈরির জন্য এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের প্রয়োজন হয়। সেটির জোগান ধাক্কা খাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।

দাম বাড়বে প্লাস্টিক পণ্যের?
আইপিএফ-এর দাবি, তাদের সদস্য যে সব সংস্থাকে প্লাস্টিক পণ্য বিক্রি করে, সেগুলির দাম বাড়ছে। তবে চেয়ার-টেবল, বালতি কিংবা অন্যান্য দৈনন্দিন বা ঘরের প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেকড়া প্রতিযোগিতার জন্য চট করে দাম বাড়ানো সহজ নয়। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেগুলিই বা কত দিন আগের দামেই বিক্রি করা যাবে, তা নিয়ে সন্দিহান তারা।
আইপিএফের আর্জি
তেল ও গ্যাসের জোগান কমলে কিছুটা সমস্যা হবেই, তা মানছেন তাঁরাও। কিংবা হেঁশেল, মিড-ডে-মিল বা হাসপাতালে রান্নার গ্যাসের জোগান বাড়াতে সরকার যে শোধনাগারে নিয়ন্ত্রণের জোর দেবে, সেটাও মানছেন আইপিএফ-এর কর্তারা। একই সঙ্গে তাঁদের দাবি, শোধনাগারগুলি যাতে দ্রুত ও কয়েকদিন অন্তর কাঁচামালের দাম না বাড়ায়, কোনও বিকল্প ব্যবস্তা গড়ে তোলা যায়, সেটাও এই শিল্পের বিপুল কর্মসংস্থান ও আমজনতার প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারের কথা মাথায় রেখে করার আর্জি জানাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের আরও আর্জি, যতদিন না যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, কাঁচামালের আমদানি বাড়াতে ও দাম নিয়েন্ত্রণে রাখতে আমদানি শুল্ক সাময়িক হ্রাস করুক কেন্দ্রীয় সরকার তাতে সরকারি কোষাগারের আয়ে খুব কিছু চাপ পড়বে না। বিকল্প পথে কাঁচামাসের আমদানি বাড়ানোর পথ খোঁজা হোক।
চিন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশের সস্তার পলিমার আমদানি ঠেকাতে অ্যান্ট ডামপিং নীতি আপাতত স্থগিত রাখা হোক। সে ক্ষেত্রে এই সব দেশ থেকে কাঁচামালের জোগান বাড়বে। করোনাকালের মতোই সংস্থাগুলির আর্থিক চাপ কমাতে কার্যকরী মূলধনের উর্ধ্বসীমা বাড়াতে ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হোক। দেশে পলিমারের দাম ঘন ঘন যাতে না বাড়ে, তা দেখতে হবে।