
সোমবার সকালে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ হলেও কক্ষপথে পৌঁছনোর আগেই নিয়ন্ত্রণ হারায় রকেট।
শেষ আপডেট: 12 January 2026 14:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের মহাকাশ অভিযানে বিশাল ধাক্কা। ইসরোর (ISRO) নির্ভরযোগ্য পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল— (PSLV-C62) অভিযান শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ল। আজ, সোমবার সকালে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ হলেও কক্ষপথে পৌঁছনোর আগেই নিয়ন্ত্রণ হারায় রকেট। এর ফলে এই উপগ্রহবাহী রকেটে থাকা ১৬টি উপগ্রহই মহাকাশে হারিয়ে গিয়েছে।
২৬০ টনের PSLV-DL এদিন সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে (IST) আকাশে উঠে দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের কাজ এবং একেকটি অংশের খসে পড়ার (stage separation) ধাপগুলিও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তৃতীয় ধাপ (third stage) জ্বলে ওঠার পরই বিপত্তি। হঠাৎ করে মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে স্পষ্ট যে, রকেট নির্ধারিত কক্ষপথে (orbit insertion) পৌঁছতে পারেনি। পরিস্থিতি অনেকটাই ২০২৫ সালের PSLV-C61 ব্যর্থতার মতো। ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন (V. Narayanan) বলেন, তৃতীয় ধাপের রকেটের কর্মক্ষমতা শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিকই ছিল। তারপর ঘূর্ণনগতিতে (roll rate) অস্বাভাবিকতা এবং উড়ানের নির্দিষ্ট পথভ্রষ্ট হওয়া লক্ষ্য করা যায়। আমরা তথ্য বিশ্লেষণ করছি, পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
এই অভিযানের প্রধান উপগ্রহ ছিল প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO-র EOS-N1 বা অন্বেষা (Anvesha)— যার কাজ সামুদ্রিক নজরদারি (maritime surveillance)। এর সঙ্গে আরও ১৫টি সহযাত্রী উপগ্রহ ছিল। এর মধ্যে ভারতীয় ছাত্রদের তৈরি পে–লোড, বেসরকারি সংস্থার পরীক্ষামূলক উপগ্রহ এবং স্পেনের KID re-entry demonstrator অন্তর্ভুক্ত ছিল। লক্ষ্য ছিল সূর্য-সমলয় কক্ষপথে (sun-synchronous orbit) প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার উচ্চতায় উপগ্রহগুলো স্থাপন করা।
সলিড বুস্টার বিচ্ছেদ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলেও উৎক্ষেপণের প্রায় আট মিনিট পর তৃতীয় ধাপে গোলমাল দেখা দেয়। আগের C61 মিশনের মতোই এবারও চেম্বার প্রেসার বা ইঞ্জিনের কার্যকারিতায় সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইসরো জানিয়েছে, রকেট তার নির্ধারিত উড়ানপথ থেকে সরে যায়। ফলে একটি ব্যর্থতা নিরূপক বিশ্লেষক কমিটি (Failure Analysis Committee) গঠন করা হচ্ছে, যদিও এখনই সমস্যার মূল কারণ জানানো হয়নি।
গত আট মাসে এটি PSLV-র দ্বিতীয় ব্যর্থতা, যা সংস্থার জন্য উদ্বেগজনক। এতদিন পর্যন্ত ৬৩টি উৎক্ষেপণের মধ্যে ৯৪ শতাংশ সাফল্যের রেকর্ড ছিল এই রকেটের। চন্দ্রযান-১ (Chandrayaan-1), আদিত্য-L1 (Aditya-L1)–এর মতো ঐতিহাসিক মিশন PSLV-ই সফলভাবে মহাকাশে পাঠিয়েছে। C61 মিশনের ব্যর্থতা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়ায় আগেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। C62-এর তৃতীয় ধাপের পুনরাবৃত্তির সমস্যা সলিড-ফুয়েল মোটর, নজল বা কেসিংয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ঘনঘন উৎক্ষেপণ সূচির চাপের মধ্যেই এই ব্যর্থতা বড় ধাক্কা।
NSIL-এর (NewSpace India Limited) মাধ্যমে হওয়া বাণিজ্যিক রাইডশেয়ার মিশনগুলোর উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা হলেও নড়বড়ে হল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের সম্প্রসারণেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরপর দুই ব্যর্থতা ইসরোর ২০২৬ সালের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যার মধ্যে ১০০-র বেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, NavIC নেভিগেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং মানব মহাকাশযান গগনযান (Gaganyaan) প্রস্তুতির কাজ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
ইসরো কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশাবাদী। PSLV-এর মডিউলার নকশা দ্রুত ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেয় বলে দাবি সংস্থার। প্রয়োজনে ভারী রকেট LVM3 ব্যবহার করেও বিকল্প পরিকল্পনা করা হতে পারে। চেয়ারম্যান ভি নারায়ণনের নেতৃত্বে ইসরো দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। আত্মনির্ভরতার পথে অটল থেকে বিশ্বের সামনে ভারতের মহাকাশ সক্ষমতা প্রমাণ করাই লক্ষ্য বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে।