ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসে অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই টানা ২৪ ঘণ্টা কাটিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়লেন ভারতীয় পর্বতারোহী রোহিতাশ খিলেরি। কেন এই কৃতিত্ব এত গুরুত্বপূর্ণ, জানুন বিস্তারিত।
.jpeg.webp)
রোহিতাশ খিলেরি
শেষ আপডেট: 22 January 2026 16:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উচ্চ পাহাড়ে অক্সিজেনের অভাবে টিকে থাকা যেখানে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই প্রায় অসম্ভব, সেখানে সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানালেন ভারতীয় পর্বতারোহী (Indian Mountaineer) রোহিতাশ খিলেরি (Rohtash Khileri)। ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসে (Mount Elbrus) অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই টানা ২৪ ঘণ্টা কাটিয়ে বিশ্বরেকর্ড (World Record) গড়লেন তিনি।
মাউন্ট এলব্রুসের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,৬৪২ মিটার। এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। বিজ্ঞানীদের মতে, এত উঁচু জায়গায় দীর্ঘ সময় থাকা দ্রুত ওঠানামার তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক। সেই কঠিন পরিস্থিতিতেই একা ২৪ ঘণ্টা কাটিয়ে ইতিহাস গড়লেন হরিয়ানার বাসিন্দা রোহিতাশ খিলেরি।
সাধারণত পর্বতারোহীদের লক্ষ্য থাকে যত দ্রুত সম্ভব শৃঙ্গে পৌঁছে নেমে আসা। কিন্তু রোহিতাশের এই রেকর্ডে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল অনেকক্ষণ সময় ধরে সেখানে থাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেনের ঘাটতি বাড়ে, শরীর আর সায় দেয় না। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় হাইপোক্সিয়া বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে কী এই সাফল্য?
বিজ্ঞানীরা এই কৃতিত্বকে বাস্তব জীবনের এক বিরল সহনশীলতার পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। উচ্চতায় বেঁচে থাকার জন্য শরীরকে খুব দক্ষভাবে অক্সিজেন ব্যবহার করতে হয়, লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়ে এবং শক্তির অপচয় কমাতে হয়। এই অভিযোজন ক্ষমতাই টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক চ্যালেঞ্জও এখানে বড় ভূমিকা নেয়। দীর্ঘ সময় অক্সিজেনের ঘাটতিতে থাকলে বিচারক্ষমতা কমে যায়, মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়। সেই অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে কঠিন, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন কেমন আছেন রোহিতাশ?
রেকর্ড গড়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন রোহিতাশ খিলেরি। তিনি জানিয়েছেন, আট বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতির ফলেই এই ‘পাগলাটে স্বপ্ন’ পূরণ হয়েছে। আগের অভিযানে ফ্রস্টবাইটের মতো সমস্যার মুখে পড়লেও তিনি থামেননি। নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব তিনি দিয়েছেন কঠোর অনুশীলন ও শৃঙ্খলাকে। এখন তাঁর এই যাত্রা মানবদেহের সহ্যশক্তি নিয়ে এক জীবন্ত গবেষণার মতোই ধরা হচ্ছে।

৫,০০০ মিটারের উপরে জীবন কেমন?
৫,০০০ মিটারের উপরে উঠলে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, সামান্য নড়াচড়াতেই প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়। ঠান্ডা, প্রবল বাতাস ও পানিশূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শরীর দ্রুত তাপ হারায়, সব ঝাপসা হয়ে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাউন্ট এলব্রুসে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাও অনেক সময় ওঠানামার মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রেকর্ড?
এই কৃতিত্ব শুধু পর্বতারোহণেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাকাশ গবেষণা, মেরু অভিযান, জরুরি উদ্ধারকাজ এবং বেঁচে থাকার বিজ্ঞানেও এর গুরুত্ব রয়েছে। মহাকাশচারীদের মতো অক্সিজেন-সঙ্কটপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা পেশাগুলোর জন্য এই ধরনের অভিজ্ঞতা গবেষণায় সহায়ক।
তাহলে কি সবাই পারবে?
বিজ্ঞানীদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে মানুষ পারলেও বাস্তবে অধিকাংশের পক্ষে এমন সহ্যশক্তি অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য বহু বছরের পরিকল্পনা এবং অসাধারণ মনের জোর প্রয়োজন। তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। রোহিতাশ খিলেরির এই রেকর্ড হয়তো নিরাপত্তার সীমা বদলায়নি, কিন্তু মানবসম্ভাবনার নতুন দিগন্ত যে খুলে দিয়েছে, তা মানছেন বিশেষজ্ঞরাও।