২০২৬ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ইতিহাসে এই প্রথম এক অভিনব ও নজরকাড়া সংযোজন হতে চলেছে ভারতীয় সেনার পশুকুল বা পোষ্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্যারেড।

ভারতীয় সেনার তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রাণী কন্টিনজেন্টে থাকবে— দুটি দুই কুঁজবিশিষ্ট উট, চারটি টাট্টু ঘোড়া, চারটি শিকারি পাখি, দশটি দেশী সেনা কুকুর এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ছয়টি প্রশিক্ষিত সামরিক কুকুর।
শেষ আপডেট: 1 January 2026 16:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৬ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ইতিহাসে এই প্রথম এক অভিনব ও নজরকাড়া সংযোজন হতে চলেছে ভারতীয় সেনার পশুকুল বা পোষ্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্যারেড। রিমাউন্ট অ্যান্ড ভেটেরিনারি কোরের (আরভিসি)-এর তত্ত্বাবধানে গঠিত এই বিশেষ বাহিনী কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে তুলে ধরবে দেশের প্রতিরক্ষায় প্রাণীদের অনন্য ও অপরিহার্য ভূমিকা।
ভারতীয় সেনার তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রাণী কন্টিনজেন্টে থাকবে— দুটি দুই কুঁজবিশিষ্ট উট, চারটি টাট্টু ঘোড়া, চারটি শিকারি পাখি, দশটি দেশী সেনা কুকুর এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ছয়টি প্রশিক্ষিত সামরিক কুকুর। সেনার ব্যাখ্যায়, এই পশুর দলটি ভারতীয় সেনার ঐতিহ্য, উদ্ভাবন ও আত্মনির্ভরতার এক অনন্য সংমিশ্রণকে তুলে ধরবে।
২০২৬ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে রাজপথে (বর্তমানে কর্তব্যপথ) যখন এই পশুকুল কুচকাওয়াজে অংশ নেবে, তখন তা মনে করিয়ে দেবে— দেশের প্রতিরক্ষা শুধু আধুনিক অস্ত্র ও সৈনিকদের উপর নির্ভর করে না, বরং অবলা প্রাণীরাও দায়িত্ব পালন করে গুরুত্ব সহকারে।
এই বিভাগের সামনে থাকবে বাহিনীতে সদ্য অন্তর্ভুক্ত ব্যাক্ট্রিয়ান উট। তীব্র শীত, স্বল্পমাত্রার অক্সিজেনের পরিবেশে ও ১৫ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় কাজ করার জন্য এই উটগুলি বিশেষভাবে উপযোগী। তারা একবারে প্রায় ২৫০ কেজি ওজন বহন করতে পারে এবং খুব অল্প খাবার ও জলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে সক্ষম। সেনার মতে, লাদাখের তুষারমরু ও দুর্গম এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) বরাবর রসদ পরিবহণ ও টহলদারিতে এই উটগুলির অন্তর্ভুক্তি বড়সড় শক্তি বৃদ্ধি করেছে।
কুচকাওয়াজে থাকছে লাদাখের স্থানীয় ও বিরল প্রজাতির জান্সকার (টাট্টু) ঘোড়াও। আকারে ছোট হলেও এদের সহনশীলতা অসাধারণ। সেনা সূত্রে জানানো হয়েছে, এই ঘোড়াগুলি ১৫ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় এবং মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৪০ থেকে ৬০ কেজি ওজন বহন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে।
২০২০ সাল থেকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সিয়াচেন হিমবাহসহ দেশের সবচেয়ে দুর্গম এলাকায় তারা দায়িত্ব পালন করছে। অনেক সময় দিনে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করে সেনাদের সঙ্গে টহল দেয় এই ঘোড়াগুলি।
এই নবগঠিত বাহিনীর কুচকাওয়াজে থাকছে চারটি র্যাপ্টর বা শিকারি পাখি। প্রকৃতিদত্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এগুলো মূলত বিমানঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাখির ধাক্কা (বার্ড স্ট্রাইক) প্রতিরোধ এবং নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়। সেনার ভাষায়, এরা এক নতুন মাত্রার সতর্কতা যোগ করেছে বাহিনীর নজরদারির কাজে।
কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ হবে সেনা কুকুর, যাদের বলা হয় ভারতীয় সেনার “নীরব যোদ্ধা”। মিরাটের আরভিসি সেন্টার অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষিত এই কুকুর সন্ত্রাসদমন অভিযান, বিস্ফোরক ও মাইন শনাক্তকরণ, ট্র্যাকিং, পাহারা, দুর্যোগে উদ্ধারকাজ এবং অনুসন্ধান অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বছরের পর বছর ধরে বহু সেনা কুকুর ও তাদের হ্যান্ডলার অসাধারণ সাহসিকতার জন্য বীরত্ব পদক ও প্রশংসাপত্র পেয়েছেন।
‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সেনাবাহিনী এখন ক্রমশ দেশী প্রজাতির কুকুর অন্তর্ভুক্ত করছে—যেমন মুধোল হাউন্ড, রামপুর হাউন্ড, চিপ্পিপারাই, কোম্বাই ও রাজাপালায়াম। সেনার মতে, কুচকাওয়াজে তাদের উপস্থিতি প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার বার্তাই বহন করবে।
সিয়াচেনের বরফঢাকা উচ্চতা থেকে লাদাখের শীতল মরুভূমি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের পাশে—এই প্রাণীগুলি নীরবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। তারা শুধু সহায়ক নয়, চার পায়ে চলা যোদ্ধা— সাহস, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতীক।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, খচ্চর, ঘোড়া, গাধা ও কুকুর নিয়ে গঠিত অ্যানিম্যাল ট্রান্সপোর্ট ইউনিট (এটিইউ) অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত চালু রাখা হবে। দুর্গম ও সড়কবিহীন অঞ্চলে রসদ পৌঁছে দিতে এই ইউনিটগুলো এখনও সেনার রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। রিমাউন্ট অ্যান্ড ভেটেরিনারি কোর ভারতীয় সেনার অন্যতম প্রাচীন শাখা, যার দায়িত্ব সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত সব প্রাণীর প্রজনন, পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা।