ভূগর্ভস্থ রেললাইন তৈরি করা হবে এবং বর্তমান রেলপথকে চার লাইনে রূপান্তরিত করা হবে। এই ভূগর্ভস্থ রেলপথ যাবে তিনমাইল হাট (Tin Mile Haat) থেকে রাঙাপানি (Rangapani) পর্যন্ত। মাটির ২০ থেকে ২৪ মিটার নীচ দিয়ে এই রেলপথ নির্মাণ হবে।

ভারত সরাসরি ভূগর্ভস্থ রেলের মাধ্যমে এই দুর্বলতম অংশকে সুরক্ষিত করতে চাইছে।
শেষ আপডেট: 4 February 2026 14:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দশকের পর দশক ধরে ভারতের কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকেনস নেক (Chicken’s Neck) বা শিলিগুড়ি করিডর বরাবরই ভারতের কাছে এক ‘দুর্বল জায়গা’। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলপথে যোগাযোগ পথ এই করিডর বহুবার চিনা হুমকির হাতিয়ার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। আর তাই এবার ভারত সরাসরি ভূগর্ভস্থ রেলের মাধ্যমে এই দুর্বলতম অংশকে সুরক্ষিত করতে চাইছে।
কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর (Siliguri Corridor) জুড়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশে ভূগর্ভস্থ রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা চলছে। পাশাপাশি যে রেললাইন রয়েছে, তাকে চার লাইনে উন্নীত করার কাজও হবে। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্বের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সংযোগকারী এই কৌশলগত করিডরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভূগর্ভস্থ রেললাইন তৈরি করা হবে এবং বর্তমান রেলপথকে চার লাইনে রূপান্তরিত করা হবে। এই ভূগর্ভস্থ রেলপথ যাবে তিনমাইল হাট (Tin Mile Haat) থেকে রাঙাপানি (Rangapani) পর্যন্ত। মাটির ২০ থেকে ২৪ মিটার নীচ দিয়ে এই রেলপথ নির্মাণ হবে।
ভৌগোলিক কারণেই এই রুট বেছে নেওয়া হয়েছে। তিনমাইল হাট পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং (Darjeeling) জেলার রাঙাপানি ব্লকে, শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এই এলাকা বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি। বাংলাদেশের পাঁচগড় (Panchagarh) জেলা এখান থেকে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার দূরে।
চিকেনস নেক (Chicken’s Neck) হল প্রায় ২২ কিলোমিটার চওড়া এক সরু স্থলপথ, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই করিডরের মধ্য দিয়েই চলে জাতীয় সড়ক, রেললাইন, জ্বালানি পাইপলাইন এবং সামরিক সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল একেবারে সংবেদনশীল। দক্ষিণে বাংলাদেশ (Bangladesh), পশ্চিমে নেপাল (Nepal),
উত্তরে চিনের চুম্বি উপত্যকা (Chumbi Valley)। চুম্বি উপত্যকায় চিনের সামরিক বাহিনী কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে কোনও সংকটে এই করিডর একাধিক দিক থেকে চাপে পড়তে পারে।
এই পথে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই উত্তর-পূর্বাঞ্চল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সিকিম (Sikkim) ও অরুণাচল প্রদেশ (Arunachal Pradesh) সীমান্তে ভারতের প্রতিরক্ষা অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। যে দুই অঞ্চলকে চিন নিজেদের বলে দাবি করে।
রেলপথ সবচেয়ে দ্রুত পণ্য পরিবহণের মাধ্যম। একটি মালবাহী ট্রেন প্রায় ৩০০টি ট্রাকের সমান বোঝা বইতে পারে। বর্তমানে চিকেনস নেকে অধিকাংশ পরিকাঠামোই ভূপৃষ্ঠে, যা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সন্দীপ উন্নিথান (Sandeep Unnithan) বলেন, ভূগর্ভস্থ রেলপথ হলে তা আকাশ, কামান বা ড্রোন হামলা থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবে। তাঁর কথায়, ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো শনাক্ত করা কঠিন এবং প্রথম আঘাতে তা টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেনা, জ্বালানি ও জরুরি সামগ্রী নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবহণ করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এটি ভারতের সুড়ঙ্গ নির্মাণ ক্ষমতার অভিজ্ঞতার প্রমাণ এবং দ্রুত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষমতার দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
গত এক দশকে চিন ডোকালাম ও অরুণাচল সীমান্তে সব ঋতুতে উপযোগী সড়ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্ত ঘিরে উত্তেজনা ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কিছু উগ্রপন্থী সংগঠন প্রকাশ্যে চিকেনস নেক বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রংপুর (Rangpur) অঞ্চলে, শিলিগুড়ির কাছেই লালমনিরহাট (Lalmonirhat) বিমানঘাঁটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা, যা দিল্লির প্রতিরক্ষা মহলে বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ভারত ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পুরনো বিমানঘাঁটি ফের চালু করছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সামরিক উপস্থিতি। নতুন সেনা ঘাঁটি তৈরি হয়েছে, চোপড়া (Chopra), বিহারের কিষানগঞ্জ (Kishanganj), অসমের লাচিত বরফুকন (Lachit Borphukan), চিনের জলপথে হামলা মোকাবিলায় হলদিয়া (Haldia)-তেও নতুন নৌঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর ভারত প্রথমবার রেলভিত্তিক মোবাইল লঞ্চার থেকে অগ্নি প্রাইম (Agni Prime) ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়। যার ফলে রেলপথে ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহণ, গোপন রাখা ও যে কোনও জায়গা থেকে উৎক্ষেপণ সম্ভব হবে।
এই প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডরে ভূগর্ভস্থ রেল প্রকল্প শুধুমাত্র আরেকটি পরিকাঠামোগত উন্নয়ন নয়। চিন ও বাংলাদেশের দ্বিমুখী চাপের মুখে এটি ভারতের এক সুস্পষ্ট কৌশলগত পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের ‘দুর্বল কণ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত চিকেনস নেককে এবার ভারত রূপ দিতে চাইছে এক “হাড়ে-মজ্জায় শক্ত মেরুদণ্ডে”।