সরকার ঐতিহাসিক গঙ্গা জলচুক্তিতে ব্যাপক পর্যালোচনা ও সংস্কার এবং সংশোধনীর আনার ভাবনাচিন্তা চালাচ্ছে বলে সূত্রে জানা গিয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে।
শেষ আপডেট: 27 June 2025 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পহলগাম কাণ্ডের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি সাময়িক বাতিল করেছিল ভারত। এবার বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার জল বিভাজন নিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী চুক্তির কথা ভাবছে নয়াদিল্লি। সরকার ঐতিহাসিক গঙ্গা জলচুক্তিতে ব্যাপক পর্যালোচনা ও সংস্কার এবং সংশোধনীর আনার ভাবনাচিন্তা চালাচ্ছে বলে সূত্রে জানা গিয়েছে।
সম্প্রতি একটি রিপোর্ট সামনে এসেছে, তাতে জানা গিয়েছে যে, গঙ্গার জল বিভাজন নিয়ে আগের চুক্তিতে বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। ‘ইকনমিক টাইমস’ নামে ইংরেজি সংবাদমাধ্যম একটি খবরে জানিয়েছে, পুরনো চুক্তি হয়েছিল পারস্পরিক সহমতের ভিত্তিতে। যদিও এবার ভারত চাইছে, সেইসব ধারা-উপধারায় নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদল ঘটাতে।
দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ুর পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিকাঠামোগত চাহিদা মেটাতে ভারত চাইছে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পুনর্বিবেচনা করতে। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সেই হিসেবে ৩০ বছরের মেয়াদি এই চুক্তি শেষ হতে চলেছে ২০২৬ সালে। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে গঙ্গার জল বিভাজন নামে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই কারণে এখন নয়াদিল্লির সরকার চাইছে, রোজকার প্রয়োজন অনুসারে এই চুক্তি নবীকরণের সঙ্গে আমূল পরিবর্তন আনতে।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জমানায় ফরাক্কা বাঁধ থেকে গঙ্গার জল ভাগ করার বিষয়ে এই চুক্তি হয়েছিল। যাতে একেবারে শুখা মরশুমে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত পর্যাপ্ত জল যায় বাংলাদেশের দিকে। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাইছেন, এই চুক্তি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করে দেখতে সরকারকে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে সুষম জলবণ্টনের দাবি তুলছেন তাঁরা।
সে কারণেই সূত্র জানা গিয়েছে, ভারত গঙ্গা অববাহিকা এলাকার সেচ, বন্দর রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদার কথা মাথায় রেখে চুক্তি পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটতে চলেছে। ফরাক্কা বাঁধ নির্মাণের সময় ঠিক ছিল এখান থেকে ৪০,০০০ কিউসেক জল ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জন্য পরিবাহিত করবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরের বছর গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট রিভার কমিশন। এবং ১৯৭৭ সালে একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি হয়। ১৯৭৮-৮২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ন্যূনতম জল দিতে থাকে ভারত।
এরপর দীর্ঘদিন ধরে দুদেশের মধ্যে তেমন কোনও বিধিনির্ভর চুক্তি হয়নি, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চলে আসছিল। কিন্তু, বাংলাদেশের মানুষের চাপে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়ার আমলে দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্ব স্থাপনে চলতি চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
গঙ্গা জলচুক্তির মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার আগে তাই জলবণ্টন নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। দুপক্ষই নতুন চুক্তি নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের শেষের দিকে দিল্লির সরকার পশ্চিমবঙ্গ, বিহারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা কমিটি গঠন করে। যেখানে দেশের ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির চাহিদা নিয়ে নিরন্তর আলোচনা চলতে থাকে।
এদিকে, চলতি বছরেরই মার্চ মাসে দুদেশের টেকনিক্যাল টিম কলকাতায় আলোচনায় বসেছিল। যেখানে ফরাক্কা থেকে জলবণ্টন নিয়ে সমঝোতাপূর্ণ ফয়সালায় উপনীত হওয়া যায় সেসব নিয়ে দীর্ঘ কথা হয়। এবছরের শেষাশেষিও ফের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে সবথেকে বড় কথা উপরি এই আলোচনার আড়ালে রাজনীতির আন্ডার কারেন্ট চলছে গঙ্গা নদীর তলা দিয়ে। ২০২৪ সালে অগস্ট থেকে বাংলাদেশে হাসিনার পতন ঘটে সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ চালাচ্ছে। সেদিক থেকে ভারত সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নয়া গঙ্গাজল চুক্তি হবে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে। বর্তমান মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার চিনের কোল ঘেঁষা হয়ে থাকায় ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খানিকটা উদ্বেগে রয়েছে। বিশেষত হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকে সেদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে রয়েছে। ফলে নয়া চুক্তি দুই প্রতিবেশী দেশের আগামী কয়েক দশকের সম্পর্ক স্থির করতে চলেছে। তবে তার থেকেও বড় স্বার্থ অর্থাৎ দেশের স্বার্থ ও রাজ্যগুলির স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে কখনই তা হবে না, একথা হলফ করে বলা যায়।