অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতার পর ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলে যে বড়সড় পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত।

শেষ আপডেট: 13 February 2026 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর পর আকাশসুরক্ষায় (Operation Sindoor air defence) জোরদার পদক্ষেপ ভারতের। রাশিয়া থেকে ২৮৮টি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য (India S-400 missile purchase) প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (Ministry of Defence)। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)-এর সভাপতিত্বে বৈঠকে এই ছাড়পত্র দেয় ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল বা ডিএসি (Defence Acquisition Council)।
সূত্রের খবর, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই ক্রয়ের জন্য ‘অ্যাকসেপ্ট্যান্স অফ নেসেসিটি’ (AoN) দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে ১২০টি স্বল্প-পাল্লার এবং ১৬৮টি দূর-পাল্লার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র। দ্রুত কেনাকাটার প্রক্রিয়া, ফাস্ট ট্র্যাক প্রোসিডিউর (FTP), মারফত এই চুক্তি সম্পন্ন হবে।
এছাড়া, আগেই চুক্তিবদ্ধ আরও দুটি এস-৪০০ সিস্টেম (S-400 Missile System) ভারত জুন ও নভেম্বর মাসে হাতে পেতে চলেছে।
অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতা
গত বছরের নভেম্বরেই প্রথম খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, অপারেশন ‘সিঁদুর’-এ ব্যবহৃত ভাণ্ডার পূরণ এবং দীর্ঘ ও স্বল্প-পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়াতে সরকার নতুন কেনাকাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এস-৪০০ ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার করে। ৪০০ কিমি, ২০০ কিমি, ১৫০ কিমি এবং ৪০ কিমি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, আর্লি ওয়ার্নিং ও নজরদারি বিমান এবং সশস্ত্র ড্রোন ধ্বংস করা হয় বলে জানা যায়।
ভারত ৩১৪ কিলোমিটার দূরত্বে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের ভেতরে একটি বড় আকৃতির বিমান লক্ষ্য করে এস-৪০০ দূর-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত হানে। এর পরই রাওয়ালপিন্ডি তাদের অধিকাংশ অপারেশনাল বিমান আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চলের ঘাঁটিগুলিতে সরিয়ে নেয়।
লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, শিয়ালকোট ও পসরুরে পাকিস্তানি রাডার স্থাপনায় ভারতের আঘাতের পর ৯-১০ মে পাকিস্তান বিমানবাহিনী কার্যত আকাশে দেখা দেয়নি। আদমপুর ও ভুজ সেক্টরে মোতায়েন এস-৪০০ ব্যবস্থার আশঙ্কাতেই তারা পিছিয়ে ছিল বলে প্রতিরক্ষা সূত্রে দাবি।
দুই স্তরের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা
ভারতীয় বায়ুসেনা রাশিয়া থেকে আরও পাঁচটি এস-৪০০ সিস্টেম কেনার প্রস্তাব রেখেছে। পাশাপাশি স্বল্প-পাল্লার প্যান্টসির ব্যবস্থা যুক্ত করার কথাও ভাবা হচ্ছে। এস-৪০০ ও প্যান্টসির একসঙ্গে ব্যবহার করে দুই স্তরের প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা সম্ভব, যা সীমান্তপারের আকাশীয় হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর হবে।
রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সশস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোন মোকাবিলাতেও অত্যন্ত কার্যকর বলে জানা গেছে।
প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটার ধাপ
ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপ রয়েছে। প্রথমে অপারেশনাল প্রয়োজন ও যুক্তি তুলে ধরে ‘স্টেটমেন্ট অফ কেস’ তৈরি হয়। এরপর প্রতিরক্ষা সচিবের নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স প্রোকিউরমেন্ট বোর্ডে তা খতিয়ে দেখা হয়।
সেখান থেকে বিষয়টি ডিএসি-র কাছে যায় ‘অ্যাকসেপ্ট্যান্স অফ নেসেসিটি’-র জন্য। অনুমোদনের পর বিক্রেতার সঙ্গে বিস্তারিত দরপত্র ও খরচ নিয়ে আলোচনা হয়। আর্থিক ছাড়পত্র দেয় উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, এবং চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় Cabinet Committee on Security (সিসিএস)।
বায়ুসেনা, স্থলসেনা ও নৌসেনার জন্য অন্যান্য ছাড়পত্র
বৃহস্পতিবার সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রায় ৩.৬০ লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে AoN দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য বহুমুখী যুদ্ধবিমান (MRFA), রাফাল, যুদ্ধাস্ত্র এবং এয়ার-শিপ-ভিত্তিক হাই অল্টিটিউড সিউডো-স্যাটেলাইট কেনার ছাড়পত্র মিলেছে। MRFA কেনা হলে সংঘাতের পূর্ণ পরিসরে আকাশে প্রাধান্য কায়েমে সক্ষমতা বাড়বে এবং দূর-পাল্লার আক্রমণে প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অধিকাংশ MRFA দেশেই নির্মিত হবে।
স্থলসেনার জন্য ‘বিভব’ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন, আর্মার্ড রিকভারি ভেহিকল (ARV), টি-৭২ ট্যাঙ্ক এবং বিএমপি-২ পদাতিক যুদ্ধযানের আধুনিকীকরণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নৌসেনার জন্য ৪ মেগাওয়াট মেরিন গ্যাস টারবাইন-ভিত্তিক বিদ্যুৎ জেনারেটর এবং পি-৮আই দীর্ঘ-পাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি বিমান কেনার অনুমোদন মিলেছে।
অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতার পর ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলে যে বড়সড় পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত। সীমান্ত পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ মাথায় রেখে, আকাশপথে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও মজবুত করার দিকেই এখন জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।