বিহারের এই গ্রামে শৈশবের পরই চলে আসে বার্ধক্য। যার শিকার হয়ে জীবদ্দশা এসে দাঁড়ায় বছর ৪০-এর মধ্যে।

এই গ্রামের ২৫ শতাংশ মানুষ লাঠি হাতে হাঁটেন।
শেষ আপডেট: 10 October 2025 18:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আয়ুষ্মান ভব। দীর্ঘজীবী হও। বেঁচে থাকো কোটি কোটি বচ্ছর। এসব আশীর্বাদ এখানে অচল। বিহারের এই গ্রামে শৈশবের পরই চলে আসে বার্ধক্য। যার শিকার হয়ে জীবদ্দশা এসে দাঁড়ায় বছর ৪০-এর মধ্যে। তার মধ্যেই জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে মৃত্যু। হ্যাঁ, এরকমই এক অজানা রোগের শিকার আত্মনির্ভর, বিকশিত ভারতের এক গ্রাম।
নাম বিনোদ বেসরা। বয়স ৫৬ বছর। তিনিই বিহারের মুঙ্গের জেলার দুধ পানিয়া গ্রামের প্রবীণতম তবে শয্যাশায়ী ব্যক্তি। ২০১৯ সাল থেকে বেসরার সঙ্গী একটি দড়ির খাটিয়া। সেখানেই শুয়ে শুয়ে প্রতিদিন তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তাবৎ গ্রামের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, তবে মৃত্যুর দোরগোড়ায়।
শুধু বেসরা একাই নন। সবুজ-সবুজে ছাওয়া, টিলাঘেরা এই দুধ পানিয়ার প্রায় সকলেই অকালমৃত্যুর কবলে পড়েন। একদা নকশাল হিংসায় দীর্ণ এই গ্রামের বাসিন্দা সংখ্যা মেরেকেটে ২৫০। কিন্তু আয়ু ৪০ বছরের মধ্যে। এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই জনজাতিভুক্ত। এখানে বেঁচে থাকাটাই এক নিদারুণ অভিশাপ। এক অজানা রোগে প্রতিটি মানুষই অকালে ঝরে যান।
প্রথমে শয্যাশায়ী হয়ে পড়া, আর তারপর ধীরে ধীরে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষায় কেটে যায়। এই গ্রামের ২৫ শতাংশ মানুষ লাঠি হাতে হাঁটেন। তাঁদের পায়ে এবং কোমর-পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। ইন্ডিয়া টুডের একটি সহযোগী চ্যানেল আজতককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেসরা বলেন, আমার সারা শরীর আস্তে আস্তে অবসন্ন হয়ে আসছে। আমার বয়স ৫৬ বছর। এভাবেই পড়ে রয়েছি ২০১৯ সাল থেকে। বাড়ির বাইরেও পা রাখার ক্ষমতা নেই আমার।
তিনি আরও বলেন, পাটনায় বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। কোনও কাজ হয়নি, একটুও উন্নতি নেই। একবার বেসরা একটি ছোট্ট আঘাত পেয়েছিলেন পায়ে। কিন্তু তা ঠিকও হয়ে যায়। তারপর থেকেই পা এবং কোমর-পিঠের জোর হারাতে শুরু করেন তিনি। ডাক্তার দেখালেই ওষুধ লিখে দেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না, হতাশ মুখে বলেন বেসরা। তাঁর সবচেয়ে দুশ্চিন্তার কারণ, পরিবারের বাকিরাও একই ভাবে ভুগছেন। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী পূর্ণী দেবীর বয়স ৪৩ বছর। আমার মেয়ে ললিতা কুমারীর বয়স ২৭ এবং ১৯ বছরের ছেলের নাম ফিলিপস কুমারও একই অসুখে ভুগছে।
বেসরার স্ত্রীর কোমর বেঁকে গিয়েছে। মেয়ে ও ছেলের অবস্থাও সেদিকেই গড়াচ্ছে। পূর্ণী দেবী বলেন, আমার ২৭ বছরের মেয়েকে দেখলে বুড়ি মনে হবে। কে তাকে বিয়ে করবে? ওর শরীর দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কী করব? আমরা বাঁচতে চাই। আমরা আশা করি সরকার নিশ্চই আমাদের কথা ভেবে কোনও উপায় বের করবে।
বর্তমানে গ্রামের ৬ জন, যাঁদের বয়স ৪৫-৫৫র মধ্যে, তাঁরা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন। বিনোদ বেসরার মতোই একই দশা কমলেশ্বর মুর্মু, ছোটা দুর্গা, বড়া দুর্গা, রেখা দেবী ও সূর্যনারায়ণ মুর্মুর। গ্রামবাসীরা জানান, ২৫ জনের বেশি লোকের একই অবস্থা হচ্ছে। তাঁরাও ধীরে ধীরে চলার শক্তি হারাতে বসেছেন। কেউ কেউ লাঠি হাতে চলেন যুবক বয়স ফুরানোর আগেই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি মহকুমা হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানকার মেডিক্যাল অফিসার সুবোধ কুমার জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ এসব কিছু জানত না। আপনারা জানানোর পর আমি গিয়েছিলাম। দেখলাম ওখানকার ২৪-৩০ বছরের যুবকদের মধ্যে হাড়ঘটিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কারও কারও পেশির যন্ত্রণাও রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে জানাচ্ছি। এর জন্য বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল তৈরি প্রয়োজন। আমরা ওঁদের মুঙ্গেরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। আমরা জলের নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। প্রাথমিকভাবে অনুমান, ভিটামিন ও খনিজের অভাবে এ ধরনের রোগ বংশানুক্রমিকভাবে দেখা দিচ্ছে। মহকুমা শাসক জানান, ওই অঞ্চলের জল পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, জলের জন্যও এই রোগ হতে পারে।