পহেলগাম হামলার নিন্দা জানানোর পর তালিবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করেন এস. জয়শঙ্কর। এই প্রথম ভারতের পক্ষ থেকে তালিবান সরকারের সঙ্গে মন্ত্রীস্তরে যোগাযোগ হলো।

এস জয়শঙ্কর ও মুত্তাকি।
শেষ আপডেট: 16 May 2025 07:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। বৃহস্পতিবার তিনি ফোনে কথা বলেন আফগানিস্তানে কার্যরত তালিবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে। এটাই ভারতের পক্ষ থেকে তালিবান প্রশাসনের সঙ্গে প্রথম মন্ত্রীস্তরের যোগাযোগ।
কিছুদিন আগেই তালিবান সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে পাকিস্তান-সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ওই হামলায় ২৬ জন নিরীহ পর্যটক নিহত হন পাক জঙ্গিদের হাতে। ভারতের পক্ষ থেকে এই সন্ত্রাসী হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল এবং তালিবানের অবস্থানকেও ভারত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।
এমনই সময়ে তালিবান ও জয়শঙ্করের মধ্যে এই ঐতিহাসিক ফোনালাপটি হয়েছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এই ফোনের কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্স-এ ড. জয়শঙ্কর লেখেন, 'আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলবি আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে আজ সন্ধ্যায় কথা হলো। পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানানোর জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আলোচনায় আফগান জনগণের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা নতুন করে বলেছি আমি এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছি।'
ড. জয়শঙ্করের পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ছড়ানোর অপচেষ্টার প্রতিবাদে মুত্তাকির 'দৃঢ় প্রতিবাদ' প্রশংসনীয়। জয়শঙ্কর লিখেছেন, 'পাক সংবাদমাধ্যমে ভারত ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক নষ্ট করার ভুয়া প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমির খান মুত্তাকির স্বচ্ছ অবস্থানকে আমি স্বাগত জানাই।'
Good conversation with Acting Afghan Foreign Minister Mawlawi Amir Khan Muttaqi this evening.
Deeply appreciate his condemnation of the Pahalgam terrorist attack.
Welcomed his firm rejection of recent attempts to create distrust between India and Afghanistan through false and…— Dr. S. Jaishankar (@DrSJaishankar) May 15, 2025
তালিবান সরকারের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক হাফিজ জিয়া আহমদের মতে, এই আলোচনায় আফগান নাগরিকদের জন্য আরও বেশি ভারতীয় ভিসা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে, বিশেষত যারা চিকিৎসার জন্য ভারতে আসতে চান। এছাড়াও আলোচনা হয়েছে, আফগান বন্দিদের মুক্তি ও প্রত্যাবর্তন নিয়ে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে এবং ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়ন নিয়ে।
চাবাহার বন্দর নিয়ে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ, এবং সীমান্ত পথও বন্ধ রয়েছে পহেলগাম হামলার পর। আফগানিস্তান যেহেতু স্থলবেষ্টিত, তাই তাদের জন্য চাবাহারই ভারতের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্যপথ হিসেবে উঠে এসেছে।
২০২১ সালের অগস্টে তালিবান সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ভারত ও তালিবান প্রশাসনের মধ্যে ধাপে ধাপে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চলছে। যদিও এখনও ভারত সরকার তালিবান প্রশাসনকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই আফগান জনগণের মানবিক সহায়তা ও কল্যাণকেন্দ্রিক।
গত মাসে পহেলগাম হামলার কয়েকদিন পর, সিনিয়র ভারতীয় কূটনীতিক আনন্দ প্রকাশ কাবুল সফর করেন এবং মুত্তাকির সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগেও জেপি সিং গত বছর দু'বার আফগানিস্তানে গিয়ে তালিবান প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুবাইয়ে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও হয়, যেখানে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল তালিবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মানবিক সহায়তা, বাণিজ্য, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা এবং চাবাহার বন্দর নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্প্রতি ভারত সরকার কনস্যুলার পরিষেবা প্রদানে তালিবানকে কিছু সীমিত ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে, যার ফলে দিল্লি, মুম্বই ও হায়দরাবাদে অবস্থিত আফগান দূতাবাসগুলো এখন কিছুটা কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ভারত আসতে ইচ্ছুক আফগান শিক্ষার্থী, চিকিৎসাপ্রার্থী বা ব্যবসায়ীদের সুবিধা হয়েছে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০,০০০ মেট্রিক টনের বেশি গম, ৩০০ টন ওষুধ, ২৭ টন ভূমিকম্প ত্রাণ, ৪০,০০০ লিটার কীটনাশক, ১০ কোটি পোলিও ডোজ, ১৫ লাখ কোভিড ভ্যাকসিন, ১১,০০০ হাইজিন কিট, ৫০০ ইউনিট শীতবস্ত্র ও ১.২ টন স্টেশনারি পাঠানো হয়েছে।
এইসব উদ্যোগ ভারতের দীর্ঘদিনের ‘জনগণকেন্দ্রিক’ আফগাননীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ।