দেশজুড়ে এখন সাইবার অপরাধে নাম কুড়িয়েছে, ‘প্রেগন্যান্ট জব’ অথবা ‘প্লেবয় সার্ভিস কেলেঙ্কারি’।

প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত পুরুষকে ফাঁদে ফেলেছিল একটি প্রতারণা চক্র।
শেষ আপডেট: 10 January 2026 18:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘আমি গর্ভবতী হতে চাই। আমায় গর্ভবতী করুন।’ ‘একজন সক্ষম পুরুষ চাই, যিনি আমাকে গর্ভবতী করতে পারবেন’। দেশজুড়ে এখন সাইবার অপরাধে নাম কুড়িয়েছে, ‘প্রেগন্যান্ট জব’ অথবা ‘প্লেবয় সার্ভিস কেলেঙ্কারি’। ২০২২ সাল থেকে বেশ কয়েকটি রাজ্যে এই স্ক্যামাররা সক্রিয় রয়েছে। এই প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত পুরুষকে ফাঁদে ফেলেছিল একটি প্রতারণা চক্র। অবশেষে বিহারের নওয়াদা জেলায় সেই চক্রের পর্দাফাঁস করল পুলিশ।
প্রতারকরা পুরুষদের কাছে দাবি করত, সন্তানহীন মহিলাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে তাঁদের গর্ভবতী করতে পারলে আর্থিক পুরস্কার মিলবে। পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছিল ভুয়ো চাকরি ও স্বল্প সুদে ঋণের প্রলোভনও। কিন্তু এর আগে ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’, হোটেল খরচ-সহ নানা অজুহাতে আগাম টাকা আদায় করা হতো।
নওয়াদা জেলার সাইবার সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (DSP) কল্যাণ আনন্দ জানান, এখনও পর্যন্ত এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৯টি মোবাইল ফোন ও একটি প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়েছে। আরও ১৮ জন অভিযুক্তের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
তবে তদন্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতারিতদের খুঁজে পাওয়া। পুলিশ আধিকারিকের কথায়, এই চক্রটি প্রায় এক বছর ধরে সক্রিয়। আমাদের ধারণা, তারা শতাধিক মানুষকে প্রতারণা করেছে। কিন্তু লজ্জা বা সামাজিক ভয়ের কারণে কেউ এখনও অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসেননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝলমলে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই প্রতারণা চালানো হচ্ছিল। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ-এ ঘুরছিল ‘All India Pregnant Job’ নামে বিজ্ঞাপন, যা দেখেই বহু মানুষ এই ফাঁদে পা দেন।
পুলিশের মতে, এই ধরনের সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচতে সোশ্যাল মিডিয়ায় চাকরি বা আর্থিক প্রস্তাব দেখলে যাচাই ছাড়া বিশ্বাস না করাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। প্রতারকরা শুধু একটি টোপেই থামেনি। সহজ-সরল পুরুষদের আকৃষ্ট করতে তারা ব্যবহার করত আরও নানা নাম ও প্রলোভন। কোথাও বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো ‘Playboy Service’, আবার কোথাও কম সুদের ঋণের নামে ‘Dhani Finance’ বা ‘SBI cheap loans’–এর মতো নাম ব্যবহার করে ভুয়ো পরিষেবা চালানো হচ্ছিল।
প্রতারণার ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিরা যখন বড় অঙ্কের টাকা রোজগারের আশায় অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, তখন তাঁদের বলা হতো— সন্তানহীন কোনও মহিলার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে তাঁকে গর্ভবতী করতে পারলে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ভুক্তভোগীদের সামনে ‘পছন্দের সুযোগ’ও রাখা হতো। একাধিক মহিলা মডেলের ছবি পাঠিয়ে বলা হতো, তাঁদের মধ্যেই কাউকে বেছে নিতে।
কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখা থেকে শুরু করে প্রতিশ্রুত টাকা হাতে পাওয়ার পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রথমেই ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’, হোটেল ভাড়া, প্রসেসিং চার্জ— এইসব নানা অজুহাতে ছোট ছোট অঙ্কের টাকা আগাম দিতে বলা হতো। ক্রমে দেখা যায়, একের পর এক টাকা দেওয়ার পরও প্রতিশ্রুতি পূরণ হচ্ছে না। তখনই অনেকের বুঝতে দেরি হয়নি যে তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আর্থিকভাবে দুর্বল স্তর থেকে আসা বহু ব্যক্তি মোটা অঙ্কের আয়ের আশায় নিজেদের সঞ্চয় হারিয়েছেন। সামাজিক লজ্জা ও ভয়েই তাঁদের অনেকেই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসেননি।
গতবছর নভেম্বরে মহারাষ্ট্রের বানের থানায় একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও বিজ্ঞাপনে এই অফার দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানিটির নাম ছিল প্রেগন্যান্ট জব। এই ভিডিওতে এক মহিলা হিন্দিতে বলেন, আমি এমন একজন পুরুষ চাই, যে আমাকে মা করতে পারবে। আমি তাকে ২৫ লক্ষ টাকা দেব। সে কী লেখাপড়া জানে, কোন জাতের কিংবা তাকে কেমন দেখতে, তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তাই দেখে এক ঠিকাদার বিজ্ঞাপনে দেওয়া ফোন নম্বরে কল করেন। একজন ওপার থেকে ফোন তুলে বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। কাজের জন্য এই লোকটিকে আগে নাম রেজিস্টার করতে হবে এবং আইডি দিতে হবে। তারপর কাজ মিলবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতারকরা বিভিন্ন ছুতোনাতায় তাঁর কাছ থেকে টাকা চায়। যেমন রেজিস্ট্রেশন ফি, আইডি কার্ড চার্জ, ভেরিফিকেশন, জিএসটি, টিডিএস এবং প্রসেসিং ফি বাবদ টাকা নেওয়া হয়। এই ভদ্রলোক অন্তত ১০০ বার ছোটখাট অনলাইন পেমেন্ট করেন। যার মোট অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় ১১ লক্ষ টাকা।
এরপর তিনি যখন কাজ চান, তখন ঠিকাদারের ফোন নম্বরটি ব্লক করে দেওয়া হয়। তাতে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন। তখনই পুলিশ জানায়, অল ইন্ডিয়া প্রেগন্যান্ট জব সার্ভিস নামে একটি প্রতারণা চক্রের কেন্দ্র হচ্ছে বিহারের নওয়াডা জেলা। এ ধরনের শয়ে শয়ে প্রতারণা ইদানীং ঘটছিল দেশ জুড়ে।