দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তল্লাশি চালিয়ে অন্তত ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে চরবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে।

কীভাবে আইএসআই-যোগে এত ভারতীয়?
শেষ আপডেট: 1 June 2025 01:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পহেলগাম হামলার প্রত্যাঘাতে ভারতের 'অপারেশন সিঁদুর'-এর (Operation Sindoor)পর নজরদারি বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তল্লাশি চালিয়ে অন্তত ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে চরবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন হরিয়ানার জনপ্রিয় ইউটিউবার জ্যোতি মালহোত্র (Jyoti Malhotra)। তবে আরও একাধিক উদাহরণ আছে, যারা কোনও না কোনওভাবে পাক এজেন্ট হয়ে কাজ করেছেন।
মুম্বইয়ে এক ইঞ্জিনিয়ার ফেসবুকে এক মহিলার প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে ভারতের যুদ্ধজাহাজের নকশা পাকিস্তানে পাঠাচ্ছিলেন। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। হরিয়ানার ট্রাভেল ভ্লগার জ্যোতি পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার ভিডিও নিজের ইউটিউব চ্যানেলে শেয়ার করেছেন। একটি ভিডিয়োতে-ও দেখা গিয়েছে, লাহোরের বেশ কিছু এলাকায় তাঁর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে।
রাজস্থানের এক ব্যবসায়ী বিগত কয়েক বছরে সাতবার পাকিস্তানে গিয়েছেন। যার কোনও বিশ্বাসযোগ্য কারণ বর্তাতে পারেননি তিনি। এমনকি তাঁর কাছ থেকে একটি সিমও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, যার সাহায্যে আইএসআই-এর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।
গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে খবর, স্থান-সময় আলাদা হলেও চরবৃত্তির পদ্ধতি প্রায় এক। এঁরা প্রত্যেকেই সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যবসা বা ভ্রমণের আড়ালে পাকিস্তানের হয়ে তথ্যপাচার করেছেন।
মোতি রাম জাট
সিআরপিএফ-এ (CRPF) কাজ করার সুবাদে মোতি রাম জাটের কাছে অপারেশন সিঁদুর সংক্রান্ত জরুরী তথ্য ছিল। সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছিল পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা। এনআইএ-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন মোতিরাম। টাকার বিনিময়ে তথ্য পাচার করতেন তিনি। চলতি মাসের শুরুতেই দিল্লিতে তাঁকে গ্রেফতার করে এনআইএ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইতিমধ্যেই বহু সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তানকে পাঠিয়েছেন ধৃত সিআরপিএফ।
বর্তমানে এনআইএ-র (NIA) হেফাজতে রয়েছেন মোতিরাম। ঠিক কী কী তথ্য পাকিস্তানকে দিয়েছেন, তা জানার চেষ্টা করছে গোয়েন্দারা। বিশেষ করে, তিনি ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনও অতি গোপন তথ্য পাচার করেছিলেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রবীন্দ্র বর্মা
মুম্বইয়ের এক ডিফেন্স টেকনোলজি ফার্মের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ায়র হিসেবে কর্মরত ছিলেন রবীন্দ্র বর্মা (২৭)। মুম্বইয়ের নৌসেনা ডকইয়ার্ডে সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ তৈরি সংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। পুলিশ সূত্রে খবর,পায়েল শর্মা ও ইসপ্রীত- এই দুই নামের ভুয়ো ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ছিল রবীন্দ্রর। নৌসেনার গোপন নকশা, ডায়াগ্রাম, অডিও নোট পাঠাতেন তিনি। এর বিনিময়ে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা ঢুকত তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, রবীন্দ্র বর্মা প্রতারণার শিকার হননি। তিনি নিজেও একাধিকবার টাকার লোভে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন। তাঁকে গ্রেফতার করেছে অ্যান্টি টেরিরিজম স্কোয়াড।
জ্যোতি মালহোত্র
ট্রাভেল ভ্লগার হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া জ্যোতি মালহোত্রকে চলতি মাসের মাঝে গ্রেফতার করে হরিয়ানার পুলিশ। অভিযোগ, তিনি পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন।
পাকিস্তানে গিয়েছিলেন জ্যোতি। সেইসময় আইএসআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে অভিযোগ। এমনকি দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের অফিসেও যাতায়াত ছিল তাঁর। ফরেনসিক পরীক্ষায় ইউটিউবারের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ থেকে চাঞ্চল্যকর নথি উদ্ধার হয়েছে। কল রেকর্ডিং থেকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একাধিকজনের সঙ্গে জ্যোতির কথোপকথন সামনে এসেছে বলেও জানা যায়।
এই ঘটনায় সন্দেহের মাত্রা বেড়ে যায়, যখন এক স্কটিশ ইউটিউবার তাঁর ভিডিয়োতে দেখান, জ্যোতি লাহোরের আনারকলি বাজারে ছয়জন সশ্রস্ত্র ব্যক্তির সঙ্গে হাঁটছেন। মালহোত্রার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির (ভারতীয় ন্যায় সনহিতা) বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়...
চলতি মে মাসের শুরুতেই গুজরাতের কচ্ছ থেকে সহদেব সিং গোহিল নামের এক স্বাস্থ্যকর্মীকে গ্রেফতার করে এটিএস। ভারতীয় বায়ুসেনা এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীরর নতুন ঘাঁটির ছবি ও ভিডিও পাকিস্তানের এক গুপ্তচরকে পাঠানোর অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। এটিএস সূত্রে খবর, ২০২৩ সালে হোয়াটসঅ্যাপে অদিতি ভরদ্বাজ নামের এক মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ হয় সহদেবের। তদন্তে উঠে আসে, 'অদিতি' পাকিস্তানের এক গোয়েন্দা সংস্থার এক ছদ্মবেশী। শুরুতে সাধারণ কথাবার্তা হলেও পরে সেনাদের খুঁটিনাটি তথ্য দিতেন সহদেব।
২০২৫ সালের শুরুতেই নিজের আধার নম্বর ব্যবহার করে নতুন একটি সিমকার্ড নেন সহদেব। সেই নম্বরেই পাকিস্তানি এজেন্টের হয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে দেন তিনি। ওটিপি-র মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভেট করা হয়েছিল। এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির থেকে ৪০ হাজার টাকা নগদও পেয়েছিলেন অভিযুক্ত।
দিন কয়েক আগেই রাজস্থানের বাসিন্দা কাসিমকে গ্রেফতার করে৩ দিল্লি পুলিশ। জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে ২০২৫-এর মার্চ মাসের মধ্যেই দু'বার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন কাসিম। তিনি অবৈধভাবে ভারতের সিমকার্ড পাকিস্তানে পাচার করতেন, যা পরে আইএসআই-এর গুপ্তচররা ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং সেনাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করত। পহেলগাম হামলার পর আতঙ্কে মোবাইল থেকে সমস্ত তথ্য মুছে ফেলেন তিনি। তবে এখনও পর্যন্ত কাসিমের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রমাণ মিলেছে বলে খবর।
২২ এপ্রিল পহেলগামে পর্যটকদের ওপর পাক জঙ্গি সংগঠনের নৃশংস হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কে ফের চিড় ধরেছে। ৭ মে 'অপারেশন সিঁদুর' অভিযানে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯ জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় ভারত। এই প্রত্যাঘাতে ১০০-র বেশি জঙ্গি নিকেশ হয়েছে বলেও জানিয়েছিল ভারতীয় সেনা। পাল্টা পাকিস্তান যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার পর সীমান্তে কড়া নজরদারি চলছে। চরবৃত্তির সঙ্গে জড়িতরাও আর পাঁচটা মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তাঁরা হয়তো আপনার পাশের বাড়িটাতেই আছে, কিন্তু আপনি টের পাবেন না। তাই নাগরিকদেরও সচেতন থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।