এই মামলার নিষ্পত্তি শুধু পতৌদি পরিবার নয়, দেশের অন্যান্য বহু বিতর্কিত ‘শত্রুসম্পত্তি’-র ভবিষ্যতের দিকও নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন আইনি মহল।

সইফ আলি খান।
শেষ আপডেট: 4 July 2025 20:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সইফ আলি খান (Saif Ali Khan Property) ও তাঁর পরিবারের উত্তরাধিকারের দাবিকে বড় ধাক্কা দিল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। ভোপাল ও রায়সেনে তাঁদের পূর্বপুরুষদের বিশাল সম্পত্তিকে ‘শত্রুসম্পত্তি’ ঘোষণার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে যে মামলাটি করেছিলেন সইফরা, তা খারিজ করে দিল উচ্চ আদালত। ওই সম্পত্তির বর্তমান মূল্য কম করে ১৫ হাজার কোটি টাকা। সেইসঙ্গে বাতিল করে দেওয়া হল ২০০০ সালে এক জেলা আদালতের দেওয়া রায়, যেখানে সইফ, তাঁর মা শর্মিলা ঠাকুর, ও দুই বোন সোহা ও সাবাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
কী বলল আদালত?
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট জানিয়েছে, জেলা আদালত ২০০০ সালে যে রায় দিয়েছিল, তা এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায় অনুসরণ করে দেওয়া হলেও মামলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা হয়নি। ফলে মামলাটি ফের নতুন করে শোনা হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। এক বছরের মধ্যে তা নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
কী এই শত্রুসম্পত্তি?
১৯৬৮ সালের শত্রু সম্পত্তি আইন (Enemy Property Act) অনুসারে, যাঁরা দেশভাগের সময় পাকিস্তানে চলে গিয়েছেন, তাঁদের নামে ভারতে থাকা সম্পত্তি সরকার ‘শত্রুসম্পত্তি’ হিসেবে অধিগ্রহণ করতে পারে। পতৌদি পরিবারের মামলায় মূলত এই আইনকেই ভিত্তি করে তাঁদের পূর্বপুরুষের সম্পত্তিকে সরকারের তরফে অধিগ্রহণ করা হয়।
সইফদের সম্পত্তিকে কেন শত্রু সম্পত্তি বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে?
তা জানতে ইতিহাসের পাতা ঘাঁটতে হবে। সইফ আলি খান ও তাঁর পরিবার হল ভোপালের শেষ নবাব হামিদুল্লাহ খানের বংশধর। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এ দেশে 'এনিমি প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৯৬৮' তথা শত্রু সম্পত্তি আইন প্রনয়ণ হয়। এই আইন অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি পাকিস্তানে বা চিনে পাড়ি জমিয়েছেন, তাঁদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি 'শত্রু সম্পত্তি' হিসেবে গণ্য হবে।
নবাব হামিদুল্লাহ খান ১৯২৬ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ভোপালের শাসক ছিলেন। ১৯৪৯ সালে একটি 'অ্যাক্সেশন চুক্তি' স্বাক্ষর করে ভোপালকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেন। ১৯৫৫ সালের রাজস্ব নথি অনুসারে, ভোপালের প্রশাসন ৫,৭৩৯ একর জমি নবাবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে: ৮৩০ একর ফিরদৌস ফার্মস, ৩০৮৭ একর চিকলোড রিট্রিট, ৩৬ একর রিজওয়ান ফার্মস, শুটিং রেঞ্জ ও শুটিং গ্রাউন্ড।
নবাব হামিদুল্লাহ খানের ছিল তিন কন্যা—আবিদা সুলতান, সাজিদা সুলতান ও রাবিয়া সুলতান। তবে বড় মেয়ে আবিদা সুলতান বিয়ে করে পাকিস্তানে চলে গেলে নবাব বিপদে পড়েন। তখন বাধ্য হয়ে তাঁর মেজ মেয়ে সাজিদা সুলতানকে নবাবের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাজিদা ছিলেন সইফ আলি খানের দাদি।
সাজিদা সুলতান পাতৌদির নবাব ইফতিখার আলি খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৫ সালে সাজিদার মৃত্যুর পর মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তি তাঁর তিন সন্তান—মানসুর আলি খান পাতৌদি, সেলেহা সুলতান ও সাবিহা সুলতানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
মানসুর আলি খান পাতৌদি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি পরে তাঁর তিন সন্তান—সইফ আলি খান, সোহা আলি খান এবং সাবা আলি খানের মধ্যে ভাগ করে দেন। সইফ আলি খান এবং তাঁর পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিগুলির মধ্যে রয়েছে—ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউস, নূর-উস-সাবাহ প্যালেস, ভোপালের ৫,৭৯৬ একর জমি, ভোপালের বাইরে আরও ১,৩৭০ একর জমি।
এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। সমস্যা হয় এর পর। সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে আগে কমবেশি বিরোধ ছিলই, পরে তা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, 'কাস্টোডিয়ান অফ এনিমি প্রপার্টি ইন ইন্ডিয়া' (CEPI) এক নোটিশ জারি করে। এতে বলা হয়, নবাব ও তাঁর পরিবার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিগুলো শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ নবাবের প্রথম উত্তরাধিকারী আবিদা সুলতান পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন।
মামলার পটভূমি ও আইনি লড়াই
১৯৬২ সালে ভারত সরকার সাজিদা সুলতানকে উত্তরাধিকারী মেনে চিঠি দিয়েছিল। তারপরেই মুসলিম পার্সোনাল আইন অনুসারে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের দাবিতে আবেদন জানানো হয় ভোপাল জেলা আদালতে। কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দেয়। সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে ২০০০ সালে হাইকোর্টে মামলা করে সাজিদা সুলতানের উত্তরসূরিরা। সইফ, তাঁর মা ও দুই বোন ছিলেন সেই মামলার অন্যতম উত্তরাধিকারী।
২০১৫ সালে ‘এনেমি প্রপার্টি কাস্টোডিয়ান অফিস’ এক তরফা সিদ্ধান্তে সম্পত্তিগুলিকে সরকারিভাবে শত্রুসম্পত্তি বলে ঘোষণা করে। এরপরেই আদালতের দ্বারস্থ হন সইফরা।
২০১৯ সালে আদালত সাজিদা সুলতানকে বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, সরকারের দাবি ছিল—যেহেতু আবিদা সুলতান পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন, তাই তাঁর অংশের সম্পত্তি শত্রুসম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং সেগুলি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এবার কী?
হাইকোর্টের নির্দেশে এখন এই সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলার শুনানি ফের শুরু হবে জেলা আদালতে। আগামী এক বছরের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এর ফলে, পতৌদি পরিবারকে নতুন করে আইনি লড়াইয়ে নামতে হবে, এবং শেষ কথা বলবে আদালতই।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই মামলার নিষ্পত্তি শুধু পতৌদি পরিবার নয়, দেশের অন্যান্য বহু বিতর্কিত ‘শত্রুসম্পত্তি’-র ভবিষ্যতের দিকও নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন আইনি মহল।