সমাজবাদী পার্টি ও বিজেপি উভয়ই ভোটপথে ব্যবহার করছে পূর্ব উত্তরের জনপ্রিয় খাবার বাটি চোখা। কেন এই সাধারণ খাবার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?

শেষ আপডেট: 2 January 2026 11:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার, নতুন বছরের প্রথম দিনটি কম-বেশি সব দলের নেতারাই ময়দানের লড়াইয়ে ইতি টেনে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছেন। আলাপ-আলোচনার সঙ্গে ছিল গান-বাজনা, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। এই ব্যাপারে সব দলকে টেক্কা দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে সমাজবাদী পার্টির (Samajwadi party) নাম। ইংরিজি নববর্ষের প্রথম দিনে লখনউয়ে দলের সদর দফতরে আয়োজন করা হয়েছিল ফিস্ট অর্থাৎ সবান্ধব আনন্দ ভোজের ব্যবস্থা। কর্মীদের সঙ্গে এক সারিতে বসে খেয়েছেন দলের সভাপতি অখিলেশ যাদব-সহ (Akhilesh Yadav) পার্টির শীর্ষ নেতারা।
দলের তরফে এই পংক্তি ভোজের নাম দেওয়া হয় ‘বাটি চোখা ফিস্ট’ (Baati Chokha)। খেতে বসার আগে সভাপতি অখিলেশ কয়েক হাজার কর্মীর উদ্দেশে বলেন, আমাদের নিয়মিত বাটি চোখা ফিস্টের আয়োজন করতে হবে। ধনী-দরিদ্র এবং সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষকে ফিস্টে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। অখিলেশের ভাষণ শুনে মনে হয়েছে, আগামী বছর রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এই খাবারটি হতে চলেছে সমাজবাদী পার্টির অন্যতম রাজনৈতিক হাতিয়ার।

'বাটি চোখা' দিয়ে সমাজবাদী পার্টির রাজনীতির বর্ষবরণ
অখিলেশ কেন এমন পংক্তি ভোজের নাম ‘বাটি চোখা ফিস্ট’ রেখেছিলেন। দিন সাতেক আগে বিজেপির একটি অনুষ্ঠানেও দলের নেতা-মন্ত্রী-বিধায়ক-সাংসদদের নিয়ে নৈশ ভোজে বাটি চোখা ছিল অন্যতম মেনু। তবে উত্তর প্রদেশ বিজেপির সভাপতি পঙ্কজ চৌধুরী (UP BJP President Pankaj Choudhary) বিশেষভাবে উপস্থিত থাকতে বলেছিলেন দলের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ভুক্ত মন্ত্রী, বিধায়ক এবং বিধান পরিষদ সদস্যদের। যোগী আদিত্যনাথ এর সরকারের ওপর নানা কারণে ক্ষিপ্ত উত্তরপ্রদেশের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষ। সম্প্রতি লখনউতে তারা সম্প্রদায়ের সম্মেলন করে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্য বিজেপির সভাপতি নৈশ ভোজে ব্রাহ্মণ জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছিলেন।

অন্যদিকে অখিলেশ ইংরেজি বছরের প্রথম দিনে দলীয় দপ্তরের ফিস্টে পার্টির সব সম্প্রদায়ের জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেন। সেখানেও প্রধান মেনু ছিল বাটি চোখা।
বাটি চোখা হল বারাণসী (Varanasi) সহ পূর্ব উত্তর প্রদেশ ও বিহারের একটি জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার, যা গমের আটা দিয়ে তৈরি 'বাটি' সদৃশ দলা চড়া আঁচের আগুনে পুড়িয়ে এবং সেদ্ধ আলু, ভাজা বেগুন ও টমেটো সেদ্ধ করে তৈরি 'চোখা' নামক ভর্তা বা মাখা সহ খাওয়া হয়। আটার দলা তৈরি করা হয় ঘি অথবা সরষের তেল মেখে। অনেকে বাটি চোখার বাটিকে লিট্টির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললেও দুটি আসলে আলাদা খাবার। লিট্টিতে থাকে ছাচুর পুর। অন্যদিকে, বাটি চোখার বাটি তৈরি করা হয় আটা অথবা ময়দার গোল্লা পুড়িয়ে।

উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করে প্রধান দুটি পার্টির দলীয় কার্যক্রমে কেন করে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল ঐতিহ্যবাহী এই খাবারটি যা কিনা বারাণসী সহ পূর্ব ভারত এবং মধ্য বিহারে বেশি জনপ্রিয় এবং চালু খাবার।রাজস্থানের মানুষও চোখা খান। তবে তাদের রান্নার পদ্ধতি উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের থেকে আলাদা।
রাজনীতিতে জনপ্রিয় এই খাবারটির গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ অবশ্যই এটি প্রধানত সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষ বেশি খান। পূর্ব উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের গরিব মানুষ বিশেষ করে ফুটপাতবাসীরা নিয়মিত বাটি চোখা খান সস্তার পুষ্টিকর খাবার হিসেবে। তপশিলি, ওবিসি, অতি পশ্চাৎপদ অংশের মানুষকে ভোটের আগে আরও কাছে টানতে জনপ্রিয় এই সস্তার খাবারটিকে হাতিয়ার করেছে বিজেপি ও সমাজবাদী পার্টি, এমনটাই বলছেন রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার ৭০-৭৫ শতাংশই সমাজের এই অংশের মানুষ। ভোটের বাক্সে যাদের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। বিজেপি ব্রাহ্মণ সমাবেশে বাটি চোখা খাওয়াতেই অখিলেশ যাদব এই খাবারটিকে জাতিগত সম্প্রীতি রক্ষার প্রয়াস হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
যদিও সস্তার খাবার বলে পরিচিত বাটি চোখা এখন হোটেল রেস্তোরাঁতেও পাওয়া যায়। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বইয়ের হোটেল, রেস্তোরায় এই খাবারটি পাওয়া নিয়মিত মেলে। যেমন পাওয়া যায় লিট্টি। আর্থিকভাবে সম্পন্ন লোকজনও এই খাবার দুটি পছন্দ করেন।