আদালত স্পষ্ট করে দেয়, প্রাণী-অধিকার নিয়ে আলোচনায় একমাত্র কুকুরকে কেন্দ্র করে ভাবলে চলবে না।

রাস্তার কুকুরের জন্য সাধারণ মানুষ ভুগছেন। মানবাধিকার রক্ষা করা জরুরি।
শেষ আপডেট: 7 January 2026 14:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পথকুকুর (stray dog) নিয়ে একগুচ্ছ মামলার শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট বুধবার প্রশ্ন তুলল, অন্য প্রাণীদের কী হবে? মুরগি, ছাগলের কি প্রাণ নেই? এই প্রশ্ন তুলে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, প্রাণী-অধিকার নিয়ে আলোচনায় একমাত্র কুকুরকে কেন্দ্র করে ভাবলে চলবে না। শুনানির সময় এক আবেদনকারী আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, রাস্তার কুকুরের হামলায় আক্রান্ত এক ৯০ বছরের বৃদ্ধের ছবি দেখাতে চান, যিনি পরে দংশনজনিত কারণে মারা যান। আবেদনকারী বলেন, দেখুন, রাস্তার কুকুর আক্রমণ করলে এটাই হয়। তবে আদালত সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে জানায়, এই ছবি দেখানোর কোনও প্রয়োজন নেই।
ভুক্তভোগীদের পক্ষে সওয়াল করে আইনজীবী বলেন, রাস্তার কুকুরের জন্য সাধারণ মানুষ ভুগছেন। মানবাধিকার রক্ষা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক নজির টেনে তিনি জানান, জাপান ও আমেরিকায় পরিত্যক্ত কুকুরদের জন্য বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে দত্তক না হলে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্বীজ করা হয়। তাঁর দাবি, এই ব্যবস্থার ফলেই জাপানে কার্যত রাস্তার কুকুরের সমস্যা নেই এবং ১৯৫০ সালের পর সেখানে রেবিসে মৃত্যুও হয়নি।
এর আগে এক প্রাণী অধিকার কর্মী আদালতে বলেন, সব রাস্তার কুকুরকে যদি ধরে খোঁয়াড়ে রাখা হয়, তাহলে আবর্জনা আর বাঁদরের সমস্যাটা কীভাবে সামলানো হবে? কুকুর না থাকলে সেই সংকট আরও বাড়বে। নয়ডায় গত বছর পথকুকুরের হামলায় আক্রান্ত এক আট বছরের শিশুর বাবাও এদিন আদালতে হাজির ছিলেন। তিনি বলেন, একই বছরে আর এক আট বছরের শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। অভিযোগ, একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও নয়ডা কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ করেনি। তাঁর দাবি, আবাসিক সংগঠনগুলিকে নিজেদের এলাকা ‘নো ডগস জোন’ ঘোষণা করার অধিকার দেওয়া হোক।
এই মামলায় উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল বলেন, আমরা এখানে কুকুরপ্রেমী হিসেবে এসেছি, আবার পরিবেশেরও পক্ষেই দাঁড়াচ্ছি। এ সময় আদালত প্রশ্ন তোলে, অন্য প্রাণীদের কী হবে? মুরগি, ছাগলের কি প্রাণ নেই? এর জবাবে সিবাল বলেন, আমি মুরগি খাওয়া বন্ধ করেছি, কারণ যেভাবে খাঁচায় তাদের রাখা হয়, তা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তিনি আরও যোগ করেন, একটি বাঘ মানুষখেকো হলে সব বাঘকে মানুষখেকো বলে মেরে ফেলা যায় না।
সিবালের বক্তব্য, গোটা পৃথিবীতেই কুকুর পাকড়াও–নির্বীজন–টিকাকরণ করে ছেড়ে দেওয়ার মডেল অনুসরণ করা হয়। তাঁর দাবি, এই পদ্ধতিতে শহরাঞ্চলে কুকুরের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব হয়েছে। ভারতের মতো দেশে যেখানে আবর্জনা ও বস্তির সমস্যা প্রকট, সেখানে রাস্তার কুকুর সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। পাশাপাশি খোঁয়াড়ে কুকুর রাখলে পুরসভাগুলির উপর বিপুল আর্থিক চাপ পড়বে এবং বহু পুর সংস্থা এখনও ABC নিয়ম অনুযায়ী এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে কাজ দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাণিকল্যাণ সংগঠনের পক্ষে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী কলিন গঞ্জালভেস বলেন, কুকুরে কামড়ানোর যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে, তা প্রকৃত সংখ্যার পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি। কারণ, প্রতিটি ইনজেকশনের ডোজকে আলাদা ‘ডগ বাইট’ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের পর থেকে ১৯টি রাজ্যে রেবিসের কোনও ঘটনা নেই। আতঙ্কের বশে কুকুর ধরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের “ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় পরিণতি” হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে সলিসিটর জেনারেল আদালতে বলেন, গোটা বিতর্কটাই কুকুরপ্রেমীদের ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, প্রাণিপ্রেমীদের নয়। তাঁর মতে, কোনও কলোনিতে কুকুর থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ব্যক্তির নয়— আরডব্লিউএ-র হওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ৯০ শতাংশ বাসিন্দা যদি কুকুর না চান, আর ১০ শতাংশ জোর করেন—তখন কী হবে? কাল যদি কেউ বলে, আমি বাড়িতে মহিষ বা গরু রাখব, তখন কী করা হবে? কুকুরে কামড়ানো এক প্রবীণ নাগরিকের পক্ষে আইনজীবী বলেন, আমার মক্কেল একজন সিনিয়র সিটিজেন। এখানে অনেক কুকুরপ্রেমী আছেন। আমরা কুকুরের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু রাস্তার কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।