কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার দিল্লি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অপহরণ এবং অবৈধ অঙ্গ প্রতিস্থানের অভিযোগ রয়েছে।

ছবিটি এআই দিয়ে বানানো (দ্য ওয়াল)
শেষ আপডেট: 21 May 2025 18:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ট্যাক্সি ও ট্রাক চালকদের খুন, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টায় আস্ত দেহ খাইয়ে দেওয়া হত কুমীরদের। ৫০-এরও বেশি খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ডাক্তারবাবু। কিন্তু প্রমাণ মেলে মাত্র ২৭টির। হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু, পেশায় এই খুনী ছিলেন চিকিৎসক। পরে তোলাবাজির হাত ধরে খুন। একাধিকবার পরিচয় গোপন করেছেন, ফিল্মি কায়দায় লুক পাল্টেছেন এবং হারিয়ে গেছেন ভিড়ের মধ্যে। হাতের নাগালে পেয়েও বার বার দুঁদে গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। চিকিৎসক থেকে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের গল্প বেশ চমকপ্রদ।
হচ্ছে 'ডাক্তার ডেথ' নামে পরিচিত দেবেন্দ্র শর্মা (৬৭)-র কথা। তিনি পুলিশদের ঘোল খাইয়ে জালে ধরা দিয়েছেন। আসলে তিনি ধরা দেননি, ধরা পড়েছেন। গোটা গল্পটা বেশ অন্যরকম।
এই দেবেন্দ্র শর্মা আয়ুর্বেদ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। 'ব্যাচেলর অফ আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি'-তে ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। চিকিৎসাই করতেন একটা সময়ে। মানুষের সেবা করতেন। কিন্তু হুট করে পাল্টে যায় জীবন। ঘুরে যায় ৩৬০ ডিগ্রি। পুলিশ সূত্রেই জানা যায়, তিনি গ্যাসের ডিলারশিপ নিতে গিয়ে ১৯৯৪ সালে ১১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন এবং বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। শুরু হয় অপরাধ জগতে আনাগোনা।
এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার দিল্লি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অপহরণ এবং অবৈধ অঙ্গ প্রতিস্থানের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে প্যারোলে ছাড়া পেয়ে ফেরার হয়ে যান। পুলিশ সোমবার তাঁকে রাজস্থানের দৌসার একটি আশ্রম থেকে গ্রেফতার করে, সেখানে তিনি নিজেকে একজন পুরোহিত বলে পরিচয় দিয়ে থাকছিলেন।
দিল্লি পুলিশের অপরাধ শাখার অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার আদিত্য গৌতম জানান, অভিযুক্ত দেবেন্দ্র দিল্লি, রাজস্থান ও হরিয়ানার বিভিন্ন আদালতে সাতটি পৃথক হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। এর মধ্যে একটি মামলায় গুরগাঁও আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রেই জানা যায়, দেবেন্দ্র ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে বহু ট্যাক্সি ও ট্রাক চালককে নৃশংসভাবে খুন করেছেন। তাঁদের দেহ ফেলে দিতেন উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জ জেলার হাজারা ক্যানালের একটি জায়গায়, যেখানে কুমিরেরা ঘোরাফেরা করত। উদ্দেশ্য ছিল— হত্যার কোনও প্রমাণ না রাখা।
১৯৮৪ সালে রাজস্থানে নিজের একটি ক্লিনিকও খোলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে অপরাধ জগতে হাত পাকানো শুরু। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে চিকিৎসক একটি চক্র গড়ে তোলেন, যারা এলপিজি বোঝাই ট্রাক ছিনতাই করত, চালকদের খুন করে দিত এবং সিলিন্ডার চুরি করত। একইসঙ্গে তিনি অবৈধ কিডনি প্রতিস্থাপন চক্রেও জড়িয়ে পড়েন। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে তিনি স্বীকার করেছেন, অন্তত ১২৫টি অবৈধ কিডনি প্রতিস্থাপনের সঙ্গে যুক্ত তিনি। বিভিন্ন রাজ্যের চিকিৎসক ও দালালদের সহযোগিতায় একাজ করেছেন।
ট্যাক্সি ও ট্রাক চালকরা ছিলেন নির্দিষ্ট টার্গেট, কীভাবে খুন করা হত?
দেবেন্দ্র এবং তাঁর সঙ্গীরা ভুয়ো ট্রিপের নাম করে ট্যাক্সিচালকদের ডেকে আনতেন। পরে খুন করে তাঁদের গাড়ি বিক্রি করে দিতেন কালোবাজারে। দেহ ফেলে দেওয়া হত কুমিরের জলাশয়ে। পুলিশের এক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাকগুলোকেও খুলে খুচরো যন্ত্রাংশ হিসেবে বিক্রি করা হত।
দিল্লি পুলিশের মতে, দেবেন্দ্র কমপক্ষে ৫০টারও বেশি খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত, যদিও প্রমাণিত হয়েছে ২৭টি খুনের, অপহরণ ও ডাকাতির মামলা। ২০০৪ সালে তাঁকে প্রথমবার গ্রেফতার করা হয়। এরপর সাতটি আলাদা মামলায় তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। শর্মাকে ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি ২০ দিনের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সাত মাস ধরে ফেরার ছিলেন, পরে জুলাইয়ে দিল্লি থেকে আবার গ্রেফতার করা হয়।
২০২৩ সালের জুন মাসে আরেকটি মামলায় (সারিতা বিহার থানায়) তাঁকে আবারও দু’মাসের জন্য প্যারোল দেওয়া হয়। কিন্তু ৩ অগস্ট ২০২৩-এর পর তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ তাঁকে খুঁজতে আলিগড়, জয়পুর, দিল্লি, আগ্রা ও প্রয়াগরাজ-সহ বিভিন্ন শহরে তল্লাশি চালায়। শেষমেশ রাজস্থানের দৌসা জেলার এক আশ্রমে খুঁজে পাওয়া যায়, সেখানে সাধুর ছদ্মবেশে ছিলেন।
একজন চিকিৎসক থেকে ভয়ঙ্কর খুনি হয়ে ওঠা দেবেন্দ্র শর্মার জীবন যেন এক বিভীষিকাময় উপন্যাসের মতো। কিন্তু বাস্তবে তাঁর অপরাধের পরিণতি এখন আইনের হাতে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে ফের আদালতে তোলা হবে এবং প্যারোল ভাঙার জন্যও নতুন করে মামলা রুজু করা হচ্ছে।