
শেষ আপডেট: 5 October 2023 17:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে লন্ডভন্ড সিকিম। অতিরিক্ত জলের চাপে ফেটে গেছে লোনাক হ্রদ। পাহাড়ি জলের ধারা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে শহরের পর শহর। ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট। জলে তলিয়ে গেছেন লোকজন। জলের চাপে ভেঙে গেছে রাজ্যের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চুংথাং বাঁধ। বহু মানুষের হতাহতের খবর এসেছে। বহু মানুষ নিখোঁজ।
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জানা গেছে বন্যার কারণে অন্তত ১৪ জন মৃত এবং ১০২ জন নিখোঁজ। ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্যে আটকে আছেন হাজার হাজার পর্যটক। কিন্তু কীভাবে ঘটল সিকিমের এই ভয়ঙ্কর প্রলয়? উদ্ধার ও ত্রাণের কাজের পাশাপাশি, বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। আর তাতেই উঠে আসছে অন্য এক তত্ত্ব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিকিমের এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে থাকতে পারে নেপালের ভূমিকম্প।
ইসরোর অধীনস্থ ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার দক্ষিণ লোনাক হ্রদের তিনটি উপগ্রহ চিত্র সামনে এনেছে। ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, ১৭ সেপ্টেম্বর যেখানে হ্রদটিতে আনুমানিক ১৬২.৭ হেক্টর আয়তনের জল ছিল, বুধবার (৪ অক্টোবর) সকালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০.৩ হেক্টরে। অর্থাৎ, দক্ষিণ লোনাক হ্রদের আয়তন ১০০ হেক্টরেরও বেশি কমেছে। সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের মতে, মেঘভাঙা বৃষ্টিতে সচরাচর এমনটা ঘটে না। হ্রদটির ফেটে যাওয়ার পিছনে নেপালের ভূমিকম্পের হাত থাকতে পারে। প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার, অর্থাৎ এই বিপর্যয় ঘটার ঠিক একদিন আগে, নেপালে পরপর চারটি ভূমিকম্প হয়েছিল। ৬.২ রিখটার মাত্রার ভূমিকম্পে অনুভূত হয়েছিল ২০ সেকেন্ড ধরে।
এই ভূমিকম্প সিকিমে আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াটার কমিশনের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, আগে থেকেই হ্রদটি দুর্বল অবস্থায় ছিল। যে কোনও সময় ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। কাজেই, ভূমিকম্পের ফলে হ্রদটি ফেটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
মনে পড়ে যায়, ২০১৫ সালের কথা। কাঠমান্ডুর ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে যে ভূমিকম্পটি (Earthquake) তৈরি হয়েছিল, তার জেরে অন্তত ৩০ বার কেঁপেছিল নেপালের মাটি। ভূ-বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, সেগুলো সব আফটারশক। এর একটার মাত্রা ছিল ৬.১। ভূবিজ্ঞানীরা সিসমোগ্রাফের তরঙ্গ ও অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেছিলেন, ভারতীয় প্লেটটি ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার সময় দু’জায়গায় ফাটল তৈরি হয়েছিল। এই ফাটল দিয়েই শক্তি নির্গত হয়ে ভূমিকম্প তৈরি হয়েছে। বারংবার কেঁপেছে নেপালের মাটি।
ভূবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা বলছেন, বছর দুয়েক ধরে নেপালে পরপর যে সব ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে গোটা হিমালয়ের ভূস্তর আরও অস্থির হয়ে গেছে। এর ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের পরেও শক্তিশালী ভূমিকম্পোত্তর কম্পন (আফটার শক) অনুভূত হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মত, হিমালয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে রেষারেষির জেরেই এই এলাকাটি অতি মাত্রায় ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এই রেষারেষির সময়ে ইন্ডিয়ান প্লেটটি যখনই ইউরেশীয় প্লেটের নীচে ঢুকে যাচ্ছে, তখন মাটির নীচে বিশাল পরিমাণ শক্তি মুক্ত হচ্ছে। আর সেই নির্গত শক্তির পরিমাপ কতটা, তার উপরে নির্ভর করছে ভূমিকম্পের মাত্রা। নেপাল ভূমিকম্পের পরেই উত্তরাখণ্ডের মাটির তলায় কী হালচাল হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হয় কেন্দ্রীয় আর্থ সায়েন্স মন্ত্রক। বিজ্ঞানীরা দেখেন, গোটা হিমালয়েই ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর ইদানীং খুবই অস্থির অবস্থায় রয়েছে। ফলে একের পর এক বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে।