এক বছরের বেশি সময় ধরে কোমায় স্বামী। তাঁর শুক্রাণু সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে মা হতে চান স্ত্রী। দিল্লি হাইকোর্টে উঠল এক নজিরবিহীন ও স্পর্শকাতর মামলা।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 8 April 2026 20:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বামী হাসপাতালের শয্যায় কোমা (coma) আচ্ছন্ন। এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি 'ভেজিটেটিভ স্টেট' বা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রয়েছেন। চিকিৎসকরা বলছেন পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বেঁচে আছেন কেবল কৃত্রিম জীবনদায়ী ব্যবস্থার (Life Support) সাহায্যে। কিন্তু এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই মাতৃত্বের আলো খুঁজতে চাইছেন স্ত্রী। স্বামীর পরও সন্তান থেকে যাবে তাঁদের মধ্যে যোগসূত্র হয়ে। তাঁদের সন্তান আসুক পৃথিবীতে, সেই ইচ্ছে প্রকাশ করে বিচারব্যবস্থার কড়া নাড়লেন এক মহিলা (wife seeks to conceive with comatose husband case)।
দিল্লি হাইকোর্টে (Delhi High Court) তাঁর আর্জি, স্বামীর শুক্রাণু সংরক্ষণ (sperm preservation comatose husband) করার অনুমতি দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে তিনি মা হতে পারেন।
আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী অর্জিত গৌর আদালতে জানান, তাঁর মক্কেলের স্বামী ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন। সময় যত এগোচ্ছে, স্বামীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এই অবস্থায় শুক্রাণুর গুণমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা জরুরি। দেরি হলে ওই মহিলার মা হওয়ার শেষ আশাটুকুও চিরতরে মুছে যেতে পারে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় 'সার্জিক্যাল স্পার্ম রিট্রিভাল' (surgical sperm retrieval)। আইভিএফ (IVF) বিশেষজ্ঞ শিবানী সচদেব জানিয়েছেন, রোগী কোমায় থাকলেও তাঁর শুক্রাণুর গুণমান সাধারণত নষ্ট হয় না। একটি সূক্ষ্ম সূঁচের সাহায্যে টেস্টিস বা অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করে তা ল্যাবরেটরিতে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমিয়ে রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত শুক্রাণু বহু বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকে, যা দিয়ে পরবর্তীকালে কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব।
মহিলা আবেদন জানিয়েছেন, একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হোক যা খতিয়ে দেখবে এই মুহূর্তে তাঁর স্বামীর শরীর থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা কতটা নিরাপদ।
আইনি জটিলতা ও সম্মতির প্রশ্ন
এই মামলার মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২১ সালের ভারতের প্রজনন সংক্রান্ত আইন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দম্পতির পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া শুক্রাণু সংগ্রহ বা ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বামী নিজেই কথা বলার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় নেই। এই পরিস্থিতিতে স্ত্রীর একার সম্মতি কি যথেষ্ট? এই প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয়েছে আইনি ও নৈতিক বিতর্ক।
আইন বলে, যদি কোনও ব্যক্তি মারা যান, তবে তাঁর পূর্বানুমতি থাকলে মরণোত্তর শুক্রাণু সংগ্রহ সম্ভব। কিন্তু জীবন্ত অথচ সংজ্ঞাহীন কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন ঠিক কী বলছে, তা নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দেশ
কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবী আয়ুষ গৌর জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামী ৯ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি। মাতৃত্বের অধিকার কি আইনি জটিলতার ঊর্ধ্বে স্থান পাবে? নাকি 'সম্মতি'র গেরোয় আটকে যাবে এক মহিলার শেষ ইচ্ছে? এখন সারা দেশের নজর দিল্লি হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের দিকে। বলাই বাহুল্য, এক করুণ মানবিক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে চলেছে দেশের বিচারবিভাগ।