নীলম চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শ থেকে যাবে পৃথিবীর আলোয়। জীবিত থাকাকালীনই তিনি তাঁর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন। শোকবিহ্বল পরিবার সেই ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

নিজের শেষ ইচ্ছেপূরণ করে কয়েক জন মুমূর্ষুকে জীবন দান করে গেলেন এই লড়াকু তরুণী
শেষ আপডেট: 8 April 2026 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লড়াইটা শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি। যখন প্রেম দিবস উদযাপন করছে গোটা দুনিয়া, তখনই ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টো শহরের রাস্তায় এক ঘাতক গাড়ি পিষে দিয়ে গিয়েছিল তাঁকে (Hit and run Sacramento Indian student)। তার পর থেকে টানা ১৪ মাস অন্ধকার কোমার জগতে লড়াই চালিয়েছেন। বুধবার অবশেষে থামল সেই লড়াই (Indian student Neelam Shinde death US)।
বিদেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মহারাষ্ট্রের মেধাবী ছাত্রী নীলম তানাজি শিন্ডে (Maharashtra student dies in USA)। তবে যাওয়ার আগে তিনি শিখিয়ে দিয়ে গেলেন জীবনবোধের এক চরম পাঠ, নিজের শেষ ইচ্ছেপূরণ করে কয়েক জন মুমূর্ষুকে জীবন দান করে গেলেন এই লড়াকু তরুণী (Neelam Shinde organ donation)।
দুর্ঘটনা থেকে যন্ত্রণার ১৪ মাস
৩৫ বছর বয়সি নীলম ছিলেন মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার ওয়াডগাঁওয়ের বাসিন্দা। গত চার বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ায় কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন তিনি। জীবনের লক্ষ্য ছিল অনেক বড়। কিন্তু ২০২৫-এর সেই অভিশপ্ত ফেব্রুয়ারির দুপুরে একটি 'হিট অ্যান্ড রান' কেস সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। মাথায় মারাত্মক চোট ছাড়াও হাত, পা এবং বুকে গভীর ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। অস্ত্রোপচার হলেও তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।
কয়েকমাস আইসিইউ-তে থাকার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে খাবার দেওয়ার নলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় দ্রুত স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। গত ২৮ মার্চ লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়া হলে নীলমের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিভে যায় নীলমের জীবনপ্রদীপ।
ভিসা জটিলতা ও পরিবারের দীর্ঘ লড়াই
নীলমের বাবা আনন্দ শিন্ডের লড়াইটা ছিল আরও কঠিন। একদিকে মেয়ে বিদেশের হাসপাতালে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে, অন্যদিকে হাতে নেই ভিসা। মুম্বইয়ের ভিসা অফিসে বারংবার আবেদন করেও জরুরি ভিত্তিতে আমেরিকায় যাওয়ার অনুমতি মিলছিল না। সেই সময় সংবাদমাধ্যমে এই খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক মহল এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা তৎপর হন।
শেষমেশ ভাই ও বাবা আমেরিকায় পৌঁছতে পারলেও ততক্ষণে নীলম অনেকটাই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এই দুর্ঘটনার ঠিক আগেই নীলমের মায়ের মৃত্যু হয়েছিল, যা তাঁর বয়স্ক বাবার কাছে ছিল এক দ্বিগুণ আঘাত।
শেষ ইচ্ছেয় অমরত্ব: মৃত্যুর পরেও জীবনের জয়গান
নীলম চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শ থেকে যাবে পৃথিবীর আলোয়। জীবিত থাকাকালীনই তিনি তাঁর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন। শোকবিহ্বল পরিবার সেই ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। প্রায় আট দিন ধরে চলা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষে নীলমের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মুমূর্ষু রোগীদের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। নীলমের মামার কথায়, "গোটা ঘটনায় এটাই একমাত্র সান্ত্বনা যে, নীলম অনেকের মধ্যে বেঁচে থাকবে।"
বিদেশের মাটিতেই অন্ত্যেষ্টি
নীলমের শেষকৃত্য বিদেশের মাটিতেই সম্পন্ন করা হয়। হিন্দু শাস্ত্রমতে ভারতের সময় অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল রাত ১টা নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হবে। সাতারার এক সাধারণ ঘরের মেয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সাত সমুদ্র পেরিয়েছিলেন। স্বপ্নপূরণ হল না ঠিকই, কিন্তু নীলম শিন্ডে প্রমাণ করে দিলেন, একজন মানুষ মৃত্যুর পরও এইভাবেই হয়তো অন্যের জীবনের আলো হয়ে উঠতে পারা সম্ভব।