আক্ষরিক, বাহ্যিক, মর্মার্থ যাই হোক না কেন, আদতে ধর্ম মানুষকে অন্ধ করে তোলে। অন্ধ করে রাখে।

ভন্ডামি দিয়ে লাখে লাখে মানুষকে অন্ধ করে রাখার এই কারিগরদের আঁশ ছাড়ানো ছাড়া কোনও গতি নেই।
শেষ আপডেট: 25 September 2025 15:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধর্ম। আড়াই অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ। যার পিছনে নিরন্তর ছুটে চলেছে সব ধর্মের মানুষ। আক্ষরিক, বাহ্যিক, মর্মার্থ যাই হোক না কেন, আদতে ধর্ম মানুষকে অন্ধ করে তোলে। অন্ধ করে রাখে। রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরামের বিরিঞ্চিবাবাই হোক কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মছলিবাবা। ভন্ডামি দিয়ে লাখে লাখে মানুষকে অন্ধ করে রাখার এই কারিগরদের আঁশ ছাড়ানো ছাড়া কোনও গতি নেই। তা সত্ত্বেও দেশের কোনায় কোনায় রোজ কোথাও না কোথাও পালা করে ভন্ডামির জোরে বিলাস-যৌনতার রাজভোগ খেয়ে চলেছে একদল ‘বাবা’।
কীসের আকর্ষণ! কোন মুক্তিলাভের আশায় মানুষ পালে পালে তাদের পদরেখা ধরে ছুটে বেড়াচ্ছে! কারা তাদের সেবক হয়ে উঠছেন, কোন আশায়! বিরিঞ্চিবাবাই হোক কিংবা মছলিবাবা, ভক্তরা সকলেই উচ্চকোটির মানুষ। শুধু গল্পে নয়, প্রকৃতই তাই। এইসব বাবাদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, বিলাসবহুল বিদেশি গাড়ি, ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর পল্টন, আশ্রমের পর আশ্রম, ঘন ঘন বিদেশযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে বহু রথী-মহারথীর অবদান। কারণ, এদেশে ধর্ম হল একটা নিরাপদ ব্যবসা ও রাজনৈতিক আবরণ। যদি না পড়ো ধরা।
আসুমল সিরুমালানি হরপালানি ওরফে আসারাম বাপু নাবালিকা ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তারপরেও গুজরাতের সুরাতের নতুন সিভিল হাসপাতালের দুই কর্মীকে দেখা যায় তাঁকে পুজো করতে। ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে একজন সিকিউরিটি গার্ড ও একজন অফিসারকে সরিয়ে দেয়। একইভাবে দিল্লি পুলিশ এখন চৈতন্যানন্দ সরস্বতী বা দিল্লি বাবা নামে পরিচিত এক স্বঘোষিত ধর্মগুরুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যাঁর বিরুদ্ধে তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেয়েরা যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছেন। দুদিন যাবৎ দিল্লিবাবা সম্পর্কে নিত্যনতুন তথ্য উঠে আসছে। আর সেই গণ্যমান্য বাবা আপাতত পুলিশের চোখে ধুলো দিতে চোরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
২০১৩ সালের অগস্ট থেকে নাবালিকা ধর্ষণের অপরাধে জেল খাটছেন আসারাম বাপু। উত্তরপ্রদেশের ১৬ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ২ মাস পরে আসারাম ও তাঁর ছেলে নারায়ণ সাইয়ের বিরুদ্ধে সুরাতের আশ্রমের ভিতরে দুই বোনকে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ হয়। বেশ কয়েকবছর ধরে সাক্ষ্যসাবুদের ভিত্তিতে মামলা চলতে থাকে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও তাঁর আশ্রমের রমরমা এখনও কমেনি। আসারামের ক্ষমতাবলে বারবার সাক্ষীদের ভয় দেখানো হয়েছে। কয়েকজন নিখোঁজ হয়ে যান। এমনকী তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকেও রোজ হুমকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এমনই রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ছিল আসারামের। যদিও বাপ-ছেলে দোষী প্রমাণিত হয়ে যাবজ্জীবন দণ্ডভোগ করছেন। ৮১ বছর বয়সি স্বামী ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশে ৭০০ কোটি টাকার জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে তাঁদের ৪০০-র বেশি আশ্রম ও ৪০টি বিদ্যালয় চলে।
হরিয়ানা-পাঞ্জাবের ডেরা সাচা সৌদার ‘মালিক’ বিখ্যাত ঈশ্বরপুত্র গুরমিত রাম রহিম সিং তাঁর দুই শিষ্যাকে ধর্ষণের দায়ে ২০ বছরের জেল খাটছেন। কিন্তু, প্রভাব-প্রতিপত্তি এমনই যে বছরের অর্ধেক দিন তিনি প্যারোলে মুক্ত থাকেন। এবং বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে কোনও ভোটের মুখে। অনেকেরই মনে থাকে না, তিনি কথন মুক্ত, কথন জেলে রয়েছন। গত ৫ অগস্টেই তিনি ৪০ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। রাম রহিম সাংবাদিক রামচন্দ্র ছত্রপতিকে খুনের অপরাধেও দোষী সাব্যস্ত। আসারামের মতোই রাম রহিমেরও লাখ লাখ ভক্ত রয়েছেন এবং যাঁদের অধিকাংশই ধনী।
২০১০ সালে স্বামীজির প্রথম ছবি বেরয় এক তামিল অভিনেত্রীকে গাঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরা অবস্থায়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বিকৃত যৌনতার অভিযোগ আনা হয়। জামিনে ছাড়া পেয়ে নিত্যানন্দ পালিয়ে যান এবং স্বঘোষিত দ্বীপরাষ্ট্র কৈলাসের আশ্রয় নেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছিলেন, রামমন্দির উদ্বোধনের সময় তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
ধনী মহল্লায় যৌন চক্র চালানোর দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন ইচ্ছাধারী ভীমানন্দ। তাঁর আসল নাম ছিল শ্রীমুরত দ্বিবেদী। কাজ করতেন দিল্লির একটি হোটেলের রক্ষী হিসেবে। ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি নিজেকে ভীমানন্দ বলে প্রচার করতে শুরু করেন। ২০১০ সালে যৌনচক্র চালানোর অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৯৭ সালে ১৩টি মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে দুবার যাবজ্জীবন সাজা হয়। প্রেমানন্দ আসলে শ্রীলঙ্কার বাসিন্দা। যে সময় তিনি গ্রেফতার হন, তখন ব্রিটেন, বেলজিয়াম, সুইৎজারল্যান্ড সহ বহু দেশে আশ্রম চালু ছিল। বিরাট সংখ্যক দেশি-বিদেশি ভক্ত ছিল প্রেমানন্দের।