দীর্ঘদিন ধরে লস্কর ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছায়া-জঙ্গি সংগঠন। এতদিন এই সংগঠনের ভিতরে বিদ্রোহের নজির প্রায় ছিল না বললেই চলে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif) এবং সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনির (Asim Munir) লস্করকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
শেষ আপডেট: 13 January 2026 14:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লস্কর-ই-তোইবা (Lashkar-e-Taiba) জঙ্গি সংগঠনের ভিতরে বড়সড় ফাটল দেখা দিয়েছে বলে অনুমান ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির। এর জেরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে লস্কর ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছায়া-জঙ্গি সংগঠন। এতদিন এই সংগঠনের ভিতরে বিদ্রোহের নজির প্রায় ছিল না বললেই চলে।
এর মধ্যেই দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী (Army Chief Upendra Dwivedi) জানিয়েছেন, জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গি (Jammu and Kashmir terrorism) নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। স্থানীয় জঙ্গির সংখ্যা এখন এক সংখ্যায় নেমে এসেছে, যা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, গত বছর ১০ মে-র পর থেকে পশ্চিম সীমান্ত এবং জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতি সংবেদনশীল হলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, লস্কর-ই-তোইবা এতদিন পাক চর সংস্থা আইএসআই (ISI) ও সেদেশের সেনাবাহিনীর (Pakistan Army) নির্দেশ মেনেই কাজ করেছে। কিন্তু, সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ঘিরে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিক জানান, সংগঠনের ভিতরে প্রবল সমস্যা শুরু হয়েছে এবং তা আর চাপা থাকছে না। সূত্রের মতে, অপারেশন সিঁদুর (Operation Sindoor, counter-terror operation) ছিল পরিস্থিতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। এই অভিযানে লস্করের বিপুল পরিকাঠামো ধ্বংস হয়। এরপর সংগঠনের পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্যাডারের মধ্যেই ধারণা তৈরি হয় যে পাকিস্তান সেনা ও আইএসআই তাদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যদিও আইএসআই সাময়িকভাবে অভ্যন্তরীণ মতভেদ মেটাতে পেরেছিল এবং পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল, কিন্তু নতুন করে সমস্যা দেখা দেয় যখন পাকিস্তান সেনা ও আইএসআই লস্করকে তালিবান (Taliban), তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) এবং বালুচিস্তান ন্যাশনালিস্ট আর্মি (BLA, Balochistan insurgency)–র বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। গোয়েন্দাদের দাবি, এই সিদ্ধান্তে লস্করের অধিকাংশ ক্যাডারই ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, পাক সংস্থাগুলি চিন ও পশ্চিমী শক্তির (China interests, Western interests) স্বার্থরক্ষায় অতিরিক্ত ঝুঁকছে। বিশেষ করে বালুচিস্তানের (Balochistan resources) দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ (Rare Earths) ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। TTP ও BLA বালুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া (Khyber Pakhtunkhwa) অঞ্চলে পাক সেনার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে সেনাবাহিনী আইএসকেপি (Islamic State Khorasan)–কে টেনে এনে লস্করের সঙ্গে জোটে যুক্ত করেছে বলে দাবি।
লস্করের নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে— চিন ও পশ্চিমের স্বার্থ রক্ষার জন্য কেন নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরতে হবে? আরও বড় সমস্যা হল, লস্কর ও আইএসকেপি আদর্শগতভাবে স্বাভাবিক বন্ধু নয়। আইএসকেপিকে তারা আফগান তালিবানের শত্রু হিসেবেই দেখে। লস্কর বরাবরই তালিবানপন্থী। ফলে পাকিস্তান সেনা যখন আফগানিস্তানে তালিবানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, তখন তা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তান বিশ্লেষকদের মতে, আগে যা ছিল গোপনে, এখন তা প্রকাশ্য অসন্তোষে রূপ নিচ্ছে। সংগঠনের নেতৃত্ব ক্যাডারদের বোঝাতে পারছে না, কেন তাদের নিজেদের লোকের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হচ্ছে। ক্যাডারদের একাংশের স্পষ্ট মত, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কেবল ভারত ও পশ্চিমী শক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করা উচিত।
সম্প্রতি লস্কর কমান্ডার মহম্মদ আশফাক রানা (Mohammad Ashfaq Rana)-র একটি ভিডিও ভাইরাল ((viral video)) হয়েছে। সেখানে তাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিতে দেখা যায়। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif) এবং সেনাপ্রধান ফিল্ডমার্শাল আসিম মুনির (Asim Munir) লস্করকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ভিডিওতে রানা বলে, একদিকে সরকার তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্যদিকে গোটা দেশকে অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঋণে জর্জরিত পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ধার করা টাকার অর্ধেকও যদি লুট না হয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার হতো, তবে দেশ আজ অনেক সমৃদ্ধ হতে পারত।
গোয়েন্দাদের মতে, এই সব ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লস্করের একাংশের সঙ্গে পাক সরকারের সম্পর্ক গভীর সংকটে। একই সঙ্গে হাফিজ সইদকে (Hafiz Saeed) প্রকাশ্যে খুব কম দেখা যাওয়াও পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নয়, তারই লক্ষণ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি লস্কর-ই-তোইবা প্রকাশ্যে বিদ্রোহের পথে হাঁটে, তবে তা পাকিস্তানের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সংগঠনটির জঙ্গিরা অত্যন্ত সেনা-ঘনিষ্ঠ এবং অতীতে তাদের বিদ্রোহের নজির প্রায় নেই। তারা যদি TTP-এর মতো গোষ্ঠীতে যোগ দেয়, তবে পাক প্রতিষ্ঠানের ভিত নড়ে যেতে পারে।
হিংসা যদি আরও বাড়ে এবং জঙ্গি সংগঠনগুলি স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে, তবে তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। একই ধরনের ভাঙনের ধারা ভবিষ্যতে জইশ-ই-মহম্মদ (Jaish-e-Mohammad)–এর মধ্যেও দেখা যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী স্পষ্ট করেছেন, অপারেশন সিঁদুর এখনও চলছে এবং ভবিষ্যতে কোনও দুঃসাহসিক পদক্ষেপের কড়া জবাব দেওয়া হবে। তিনি জানান, সিএপিএফ, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজ্য প্রশাসন ও বিভিন্ন মন্ত্রকের সমন্বিত উদ্যোগেই এই অভিযান সফল হয়েছে। তাঁর কথায়, অপারেশন সিঁদুর ছিল নিখুঁত রাজনৈতিক পদক্ষেপে ত্রি-সেনা সমন্বয়ের এক দৃষ্টান্ত। অভিযানে নয়টি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সাতটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে স্থল অভিযান চালাতে সেনা পুরোপুরি প্রস্তুত।